যুদ্ধের ছায়ায় বিশ্বকাপ ১৯৩৮

ফাইল ছবি
২১ মে ২০২৬, ০২:৪৬
নিউজ ডেস্ক
তৃতীয় ফুটবল বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই ইউরোপজুড়ে যুদ্ধের অশনি সংকেত স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি বাহিনী ‘আনশলুস’-এর মাধ্যমে অস্ট্রিয়া দখল করে নেয়। অস্ট্রিয়ার সেরা ফুটবলারদের জার্মান দলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অন্যদিকে স্পেন তখন গৃহযুদ্ধের আগুনে পুড়ছে। দক্ষিণ আমেরিকাতেও চলছিল রাজনৈতিক ও ফুটবলীয় অস্থিরতা। ফলে উরুগুয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, তারা ইউরোপে খেলতে যাবে না। তাদের পথ অনুসরণ করে আর্জেন্টিনাও বিশ্বকাপ বয়কট করে।
আর্জেন্টিনার ক্ষোভ ও ফরাসি কূটনীতি
১৯৩৬ সালে বার্লিনে অনুষ্ঠিত ফিফা কংগ্রেসে তৃতীয় বিশ্বকাপ আয়োজনের দৌড়ে ছিল আর্জেন্টিনা। তবে শেষ পর্যন্ত স্বাগতিকের দায়িত্ব পায় ফ্রান্স। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে বুয়েনস এয়ার্সের ফুটবলপ্রেমীরা। ফুটবল ফেডারেশনের কার্যালয়ের বাইরে বিক্ষোভ ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশকে হস্তক্ষেপ করতে হয়।
নতুন ইতালি, নতুন শক্তি
১৯৩৪ সালের চ্যাম্পিয়ন ইতালি এবারও ছিল অন্যতম ফেবারিট। পুরোনো দলের অভিজ্ঞ খেলোয়াড়দের সঙ্গে যুক্ত হয় নতুন প্রজন্মের তারকারা। সবার নজরের কেন্দ্রে ছিলেন সেন্টার ফরওয়ার্ড সিলভিও পিওলা। লম্বা গড়ন, গতি, শক্তি ও অসাধারণ গোল করার ক্ষমতায় তিনি দ্রুতই ইউরোপের অন্যতম সেরা ফরওয়ার্ডে পরিণত হন।
গোলপোস্টে ছিলেন নির্ভরযোগ্য আলদো ওলিভেরি। রক্ষণে ফনি ও রাভা, মাঝমাঠে লোকাটেলি এবং আক্রমণে বিয়াভাতি, কলৌসি, মিজ্জা ও ফেরারির সমন্বয়ে গড়ে ওঠে দুর্ধর্ষ এক ইতালি দল।
কোচ ভিট্টোরিও পোজো পরে লিখেছিলেন, “১৯৩৮ সালের দল ছিল অসাধারণ সমন্বিত ও নমনীয়।”
ব্রাজিলের আবির্ভাব
যদিও ইতালিকে সবচেয়ে শক্তিশালী দল ধরা হচ্ছিল, তবু ফুটবল বিশ্বকে সবচেয়ে বেশি মুগ্ধ করেছিল ব্রাজিল। তাদের আক্রমণের প্রাণ ছিলেন কিংবদন্তি লিওনিডাস। বাইসাইকেল কিক, গতি ও গোল করার অসাধারণ দক্ষতায় তিনি ইউরোপকে বিস্মিত করে দেন।
তার পাশে ছিলেন ডোমিঙ্গোস ডা গাইয়া ও ডাক্তার-ফুটবলার ডাঃ নারিজ। হাঙ্গেরির হয়ে খেলছিলেন জর্জ সারোশি ও তরুণ প্রতিভা গিউলা সেঞ্জেলার।
উত্তপ্ত সূচনা
প্রথম রাউন্ডে মার্সেইয়ে ইতালির মুখোমুখি হয় নরওয়ে। ম্যাচের আগে ফ্যাসিবাদবিরোধী দর্শকদের বিদ্রূপে উত্তপ্ত হয়ে ওঠে স্টেডিয়াম। কোচ পোজো খেলোয়াড়দের নির্দেশ দেন, চিৎকার থামা পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট স্যালুট ধরে রাখতে।
মাঠেও কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে ইতালি। নির্ধারিত সময়ে স্কোর ছিল ১-১। অতিরিক্ত সময়ে পিওলার গোলে ২-১ ব্যবধানে জিতে কোনোমতে পরের রাউন্ডে ওঠে তারা।
অন্যদিকে পোল্যান্ডের বিপক্ষে ব্রাজিলের ম্যাচ ইতিহাসে স্থান করে নেয়। অতিরিক্ত সময়সহ ম্যাচে হয় ১১ গোল। লিওনিডাস ও পোল্যান্ডের আর্নেস্ট উইলিমোস্কি—দুজনই করেন চারটি করে গোল। শেষ পর্যন্ত জয় পায় ব্রাজিল।
কোয়ার্টার ফাইনালের যুদ্ধ
কোয়ার্টার ফাইনালে স্বাগতিক ফ্রান্সের বিপক্ষে ইতালি দুর্দান্ত ফুটবল উপহার দেয়। পিওলার নেতৃত্বে ৩-১ গোলে জিতে সেমিফাইনালে ওঠে তারা।
অন্যদিকে ব্রাজিল ও চেকোস্লোভাকিয়ার ম্যাচ রীতিমতো যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়। লাথি, সংঘর্ষ, বহিষ্কার—সব মিলিয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়। আহত হন লিওনিডাসসহ একাধিক খেলোয়াড়। রিপ্লেতে ব্রাজিল জিতে শেষ চারে ওঠে।
পোজোর মনস্তাত্ত্বিক খেলা
সেমিফাইনালের আগে ইতালির কোচ ভিট্টোরিও পোজো ব্রাজিল শিবিরে গিয়ে মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরির চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “হারলে কিন্তু আবার বোরদেও ফিরতে হবে।”
আত্মবিশ্বাসী ব্রাজিলিয়ানরা বলেছিল, “আমরাই জিতব।”
কিন্তু মাঠের গল্প ছিল ভিন্ন। মার্সেইয়ে ইতালির কৌশলী ফুটবলের সামনে ভেঙে পড়ে ব্রাজিল। পিওলার আক্রমণ, মিজ্জার নেতৃত্ব এবং ইতালির রক্ষণাত্মক শৃঙ্খলা ব্রাজিলকে ছন্দহীন করে দেয়। শেষ পর্যন্ত ২-১ ব্যবধানে জিতে ফাইনালে ওঠে ইতালি।
অন্য সেমিফাইনালে হাঙ্গেরি ৫-১ গোলে উড়িয়ে দেয় সুইডেনকে।
ফাইনালে ইতালির দাপট
ফাইনালে ইতালির প্রতিপক্ষ ছিল হাঙ্গেরি। ম্যাচের শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে থাকে ইতালি। কলৌসি দ্রুত গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। যদিও টিটকস সমতা ফেরান, তবে এরপর আর থামেনি ইতালি।
মিজ্জা, ফেরারি, পিওলা ও কলৌসির দুর্দান্ত সমন্বয়ে হাঙ্গেরির রক্ষণ ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়। পিওলা করেন অসাধারণ গোল। শেষ পর্যন্ত ৪-২ ব্যবধানে জিতে টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বকাপ জেতে ইতালি।
শেষ বাঁশি বাজতেই আবেগে ভেঙে পড়েন ইতালির খেলোয়াড়রা। কেউ কাঁদছিলেন, কেউ আলিঙ্গনে ডুবে গিয়েছিলেন। কোচ পোজোও আবেগ সামলাতে পারেননি।
তারপর নেমে এলো যুদ্ধ
১৯৩৮ সালের বিশ্বকাপ শেষ হওয়ার কিছুদিন পরই বিশ্ব ডুবে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অন্ধকারে। থেমে যায় ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসর। আবার বিশ্বকাপ ফিরতে অপেক্ষা করতে হয় দীর্ঘ ১২ বছর—১৯৫০ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপ পর্যন্ত।









