বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

অভিভাবকের ভূমিকা, প্রাপ্তবয়স্ক নারীর সম্মতি ও বিয়ের সামাজিক স্বীকৃতি নিয়ে ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গি

প্রেমের সম্পর্ক থেকে অনেক তরুণ-তরুণী পরিবারকে না জানিয়ে বা পরিবারের সম্মতি ছাড়াই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন। কখনো পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে যায় যে, তারা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো—ইসলামের দৃষ্টিতে এমন বিয়ের অবস্থান কী? অভিভাবকের সম্মতি কি অপরিহার্য? আর পরিবার অন্যায়ভাবে বিয়েতে বাধা দিলে করণীয়ই বা কী?

ইসলামে বিয়ে কেবল দুজন মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক নয়; এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও নৈতিক বন্ধন। এর সঙ্গে পরিবার, বংশধারা, অধিকার ও দায়িত্বের বিষয়ও জড়িত। তাই ইসলাম বিয়েকে স্বচ্ছ, দায়িত্বশীল ও সামাজিকভাবে স্বীকৃত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন করতে উৎসাহিত করেছে।

বিয়েতে অভিভাবকের ভূমিকা

পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, “তোমরা তাদেরকে তাদের অভিভাবকদের অনুমতিক্রমে বিয়ে করো।” (সুরা আন-নিসা, ২৫)

এ আয়াত থেকে বিয়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকের ভূমিকার গুরুত্ব বোঝা যায়। একইভাবে সুরা আন-নূরের ৩২ নম্বর আয়াতে অবিবাহিতদের বিয়ে দেওয়ার জন্য সমাজ ও পরিবারকে উদ্যোগী হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ ইসলাম এমন একটি বিবাহব্যবস্থা চায়, যেখানে সম্পর্কটি গোপনীয়তার পরিবর্তে দায়িত্ব, স্বচ্ছতা ও সামাজিক স্বীকৃতির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হবে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “অভিভাবক ছাড়া কোনো বিয়ে নেই।” (সুনান আবু দাউদ, ২০৮৫; তিরমিজি, ১১০১)

আরেক হাদিসে এসেছে, কোনো নারী তার অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে করলে সেই বিয়ে বাতিল—এমন বক্তব্যও হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। (তিরমিজি, ১১০২; ইবনে মাজাহ, ১৮৭৯)

এসব হাদিসের ভিত্তিতে অধিকাংশ ইসলামি ফকিহ বিয়েতে ওয়ালি বা অভিভাবকের উপস্থিতি ও ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন।

বিয়ে গোপন না করে প্রকাশ করার শিক্ষা

ইসলামে বিয়েকে প্রকাশ করার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিয়েকে প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর উদ্দেশ্য হলো, বৈধ দাম্পত্য সম্পর্ককে সামাজিকভাবে স্পষ্ট করা এবং গোপন সম্পর্ক থেকে সৃষ্ট সন্দেহ, অপবাদ ও নানা জটিলতা এড়িয়ে চলা।

এই দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবারকে সম্পূর্ণ অন্ধকারে রেখে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করা ইসলামি বিবাহব্যবস্থার আদর্শ পদ্ধতি নয়।

তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—‘পালিয়ে বিয়ে’ এবং ‘অভিভাবকের অনুমতি ছাড়া বিয়ে’—দুটিকে সব মাজহাবের দৃষ্টিতে একইভাবে দেখা হয় না।

বিভিন্ন মাজহাবের মতপার্থক্য

ইমাম মালিক রহ., ইমাম শাফেয়ি রহ. এবং ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ.-এর মত অনুযায়ী, প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিয়েতেও ওয়ালির ভূমিকা অপরিহার্য। তাঁদের ফিকহি মতের ভিত্তিতে ওয়ালি ছাড়া সম্পন্ন বিয়ে সহিহ নয়।

ইমাম নববি রহ. তাঁর ব্যাখ্যাগ্রন্থে অধিকাংশ আলেমের এই মতের কথা উল্লেখ করেছেন। ইমাম ইবনে কুদামা রহ.-ও ‘আল-মুগনি’ গ্রন্থে ওয়ালির প্রয়োজনীয়তার পক্ষে বিভিন্ন দলিল ও সাহাবিদের আমল তুলে ধরেছেন।

অন্যদিকে ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর ফিকহি মত কিছুটা ভিন্ন। তাঁর মতে, প্রাপ্তবয়স্ক ও বিবেচনাশীল নারী উপযুক্ত বা সমমানের পাত্রকে নিজে বিয়ে করতে পারেন। তবে বিয়েতে অভিভাবকের ভূমিকা ও পারিবারিক বিবেচনাকে তিনি অপ্রয়োজনীয় বলেছেন—এমনটা নয়।

অর্থাৎ এ বিষয়ে ইসলামি ফিকহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মতপার্থক্য রয়েছে। তাই ‘অভিভাবক ছাড়া কোনো অবস্থাতেই বিয়ে বৈধ নয়’—এটিকে সব মাজহাবের সর্বসম্মত মত হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক নয়।

তাহলে পালিয়ে বিয়ের সমস্যা কোথায়?

পালিয়ে বিয়ের ক্ষেত্রে আপত্তির বিষয় শুধু অভিভাবকের অনুমতি নয়। এর সঙ্গে আরও কিছু সামাজিক ও নৈতিক ঝুঁকি জড়িয়ে থাকতে পারে।

পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়া, পারস্পরিক আস্থার সংকট, ভবিষ্যৎ পারিবারিক বিরোধ, আর্থিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তা—এসব বিষয় অনেক সময় দাম্পত্য জীবনকে জটিল করে তোলে।

ইসলাম যে বিবাহব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেখানে ভালোবাসা ও পারস্পরিক পছন্দের পাশাপাশি দায়িত্ব, স্বচ্ছতা এবং ভবিষ্যৎ জীবনের বাস্তব প্রস্তুতিকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

তাই শুধু আবেগের বশে পরিবারকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করাকে ইসলামি বিবাহের আদর্শ পদ্ধতি বলা যায় না।

পরিবার অন্যায়ভাবে বাধা দিলে?

এখানেও ইসলামের অবস্থান ভারসাম্যপূর্ণ।

কোনো অভিভাবক যদি অন্যায়ভাবে উপযুক্ত পাত্রের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে আটকে দেন, তাহলে শুধু অভিভাবকের আপত্তির কারণে একটি বৈধ বিয়ের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে—ইসলাম এমন পরিস্থিতিকে সমর্থন করে না।

শরিয়াহর কাঠামোয় এমন ক্ষেত্রে কাজি বা বৈধ ইসলামি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের সুযোগ রয়েছে। অর্থাৎ অভিভাবক অন্যায়ভাবে বাধা দিলে তার সেই অবস্থানকে চূড়ান্ত বলে ধরে নেওয়া হবে না।

এখানে মূল বিষয় হলো—বিয়ের সিদ্ধান্ত যেন আবেগ, জেদ বা প্রতিশোধের ভিত্তিতে না হয়ে ন্যায়, শরিয়াহ ও সংশ্লিষ্ট সবার অধিকার বিবেচনায় নেওয়া হয়।

শুধু পালিয়ে গেলেই বিয়ে বাতিল?

এখানে সবচেয়ে বেশি সতর্কতা প্রয়োজন।

কোনো প্রাপ্তবয়স্ক নারী ও পুরুষ পরিবারকে না জানিয়ে বিয়ে করলে সেই বিয়ে বৈধ হয়েছে কি না—তা নির্ভর করবে কোন ফিকহি মত অনুসরণ করা হচ্ছে এবং বিয়ের অন্যান্য শর্ত পূরণ হয়েছে কি না তার ওপর।

ইজাব-কবুল, সাক্ষী, মোহর এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়েছে কি না—এসবও বিবেচ্য। হানাফি ফিকহে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর নিজ সিদ্ধান্তে উপযুক্ত পাত্রকে বিয়ে করার সুযোগ রয়েছে; অন্যদিকে মালিকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাজহাবে ওয়ালির ভূমিকা অপরিহার্য বলে বিবেচিত।

সুতরাং শুধু ‘পালিয়ে বিয়ে করেছে’—এই একটি তথ্যের ভিত্তিতে কোনো নির্দিষ্ট বিয়েকে বৈধ বা অবৈধ বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া ঠিক নয়। বাস্তব ঘটনা ও বিয়ের শর্তগুলো যাচাই করে যোগ্য আলেম বা মুফতির পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ভালোবাসা কি ইসলামে নিষিদ্ধ?

বিয়ের আগে কারও প্রতি ভালো লাগা বা ভালোবাসার অনুভূতি তৈরি হওয়া মানুষের স্বাভাবিক বিষয়। ইসলাম অনুভূতির অস্তিত্বকে অপরাধ হিসেবে দেখে না; বরং সেই অনুভূতিকে কীভাবে বৈধ ও দায়িত্বশীল পথে পরিচালনা করা হচ্ছে, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।

যদি দুজনের মধ্যে বিয়ের ইচ্ছা তৈরি হয়, তাহলে সম্পর্ককে গোপন ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার পরিবর্তে পরিবারকে জানিয়ে বৈধ পথে বিয়ের উদ্যোগ নেওয়াই উত্তম।

কারণ ভালোবাসার সঙ্গে যখন দায়িত্ব যুক্ত হয়, তখনই তা স্থায়ী দাম্পত্য সম্পর্কে রূপ নিতে পারে।

শেষ কথা

ইসলামের দৃষ্টিতে বিয়ে শুধু আবেগের সিদ্ধান্ত নয়; এটি আজীবনের দায়িত্ব ও অঙ্গীকার। তাই প্রেমের টানে হঠাৎ বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করার আগে ভবিষ্যৎ জীবন, পারিবারিক সম্পর্ক, আর্থিক দায়িত্ব এবং শরিয়াহর শর্ত—সবকিছু বিবেচনা করা জরুরি।

অভিভাবকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অভিভাবকের অন্যায়ও ইসলাম সমর্থন করে না। একইভাবে নিজের পছন্দের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতা ও শরিয়াহর বিধান মানা প্রয়োজন।

তাই ইসলামের আদর্শ পথ হলো—গোপনীয়তা নয় স্বচ্ছতা, আবেগের তাড়না নয় দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত, পরিবারকে পাশ কাটানো নয় আলোচনার মাধ্যমে সমাধান এবং অবৈধ সম্পর্ক নয় বৈধ বিবাহের মাধ্যমে ভালোবাসাকে মর্যাদা দেওয়া।

ভালোবাসা যদি সত্যিই জীবনসঙ্গীর দিকে নিয়ে যায়, তাহলে সেই ভালোবাসার সবচেয়ে সুন্দর পরিণতি হওয়া উচিত এমন একটি বিবাহ—যেখানে আল্লাহর সন্তুষ্টি, পারস্পরিক সম্মান, দায়িত্ববোধ এবং উভয় পরিবারের মর্যাদা রক্ষা পায়।