সোমবার, ২৭ জুলাই ২০২৬, ১২ শ্রাবণ ১৪৩৩

হৃদরোগ বা হার্ট অ্যাটাক একসময় কেবল বয়স্কদের রোগ হিসেবে বিবেচনা করা হলেও, বর্তমানে তরুণ ও যুবকদের মধ্যে এর প্রবণতা আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, লিভারে অতিরিক্ত মেদ (ফ্যাটি লিভার) জমা শুধু লিভারেরই ক্ষতি করে না, বরং কম বয়সেই হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি মারাত্মকভাবে বাড়িয়ে দেয়। রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, উচ্চ রক্তচাপ এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের কারণে এই দুটি সমস্যা মূলত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নিজের অজান্তেই প্রতিদিনের কিছু ক্ষতিকর অভ্যাসের কারণে তরুণ প্রজন্ম শরীরের এই বড় বিপদ ডেকে আনছে।

বাঙালির রান্নাঘরে তেল একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মাছ ভাজা, লুচি, পরোটা, বেগুনি, চপ, কাটলেট কিংবা নানা ধরনের ঝাল-মসলাদার মুখরোচক রান্না তেল ছাড়া যেন ভাবাই যায় না। কিন্তু ক্ষণিকের স্বাদের জন্য খাবারে অতিরিক্ত তেল ব্যবহার করার এই অভ্যাস ধীরে ধীরে শরীরের জন্য কতটা কাল হয়ে দাঁড়াচ্ছে, তা নিয়ে কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছেন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞরা।

চিকিৎসকরা বলছেন, শরীরের স্বাভাবিক কাজকর্ম সচল রাখার জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণের চর্বি বা ফ্যাটের প্রয়োজন আছে। কিন্তু সেই প্রয়োজনীয় মাত্রার চেয়ে বেশি তেল খাওয়া শুরু করলেই শরীরে অপ্রয়োজনীয় ক্যালোরি জমতে থাকে, যার ফলে ওজন দ্রুত বৃদ্ধি পায়। আর এই অতিরিক্ত ওজন থেকেই শরীরে বাসা বাঁধে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং ক্রনিক হৃদরোগের মতো মারাত্মক সব ব্যাধি।

অতিরিক্ত তেলের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমাদের হৃদযন্ত্র। নিয়মিত বেশি তেল ও চর্বিযুক্ত খাবার খেলে রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা এলডিএল (LDL)-এর মাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এই চর্বি বা কোলেস্টেরল একপর্যায়ে হার্টের রক্তবাহী ধমনির ভেতরের দেয়ালে জমতে শুরু করে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্লাক’ বলা হয়। এর ফলে ধমনি সরু হয়ে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় এবং তীব্র বুক ব্যথাসহ আকস্মিক হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের আশঙ্কা তৈরি হয়।

শুধু হৃদযন্ত্রই নয়, অতিরিক্ত তেল বা রিফাইন্ড ফ্যাটের নেতিবাচক প্রভাব পড়ে লিভারের ওপরও। বর্তমানে অল্প বয়সীদের মধ্যে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা জ্যামিতিক হারে বাড়ছে। অতিরিক্ত তেল, ফাস্টফুড, জাঙ্ক ফুড এবং প্রক্রিয়াজাত খাবার নিয়মিত খেলে লিভারে চর্বির আস্তরণ জমতে থাকে। প্রাথমিক অবস্থায় এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ বা উপসর্গ প্রকাশ না পেলেও, ধীরে ধীরে লিভারের কার্যক্ষমতা পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যেতে পারে এবং লিভারে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ (NASH) দেখা দেয়।

তরুণদের আরেকটি বিপজ্জনক অভ্যাস হলো একই ভোজ্যতেল বারবার গরম করে ব্যবহার করা। বাসাবাড়িতে কিংবা বাইরের হোটেল-রেস্তোরাঁয় ভাজার পর বেঁচে যাওয়া তেল পুনরায় ব্যবহার করার প্রবণতা খুব বেশি দেখা যায়। চিকিৎসকদের মতে, একই তেল বারবার উচ্চ তাপমাত্রায় গরম করলে তেলের রাসায়নিক গঠন বদলে যায় এবং এতে ক্ষতিকর ‘ট্রান্স ফ্যাট’ ও ফ্রি-র‍্যাডিক্যাল তৈরি হয়। এগুলো শরীরে প্রবেশ করে কোষের ডিএনএ নষ্ট করে এবং হৃদরোগসহ ক্যান্সারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

সুরক্ষার উপায় ও চিকিৎসকদের পরামর্শ

তবে সুস্থ থাকার অর্থ এই নয় যে আপনি পুরোপুরি তেল খাওয়া বন্ধ করে দেবেন। চিকিৎসকদের মতে, সুস্থ হার্টের জন্য সুস্থ লাইফস্টাইল জরুরি:

পরিমিত ও ভালো তেল: রান্নায় পরিমিত পরিমাণে খাঁটি সরিষার তেল, চিনাবাদাম তেল কিংবা ভালো মানের উদ্ভিজ্জ তেল (ভেজিটেবল অয়েল) ব্যবহার করা উচিত।

রান্নার ধরন বদলানো: ডুবো তেলে ভাজাভুজির অভ্যাস কমিয়ে খাবার সেদ্ধ, বেকড, গ্রিল কিংবা সামান্য তেলে (শ্যালো ফ্রাই) রান্না করার অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে।

সুষম খাদ্যতালিকা: প্রতিদিনের খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণে সবুজ শাকসবজি, টাটকা ফলমূল, ডাল, ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ মাছ ও চর্বিহীন প্রোটিন রাখতে হবে।

শারীরিক সক্রিয়তা: অলস জীবনযাপন পরিহার করে প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট দ্রুত হাঁটা, দৌড়ানো বা কায়িক পরিশ্রম করা উচিত, যা শরীরে অতিরিক্ত মেদ বা চর্বি জমতে বাধা দেয়।

মনে রাখতে হবে, হার্ট অ্যাটাকের মতো বড় রোগ একদিনে বা হঠাৎ করে হয় না। প্রতিদিনের খাবারে অল্প অল্প করে নেওয়া বাড়তি তেল ও অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাত্রাই ভবিষ্যতে অকাল মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই দীর্ঘায়ু ও সুস্থ হার্টের জন্য তেলের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণে রাখাই হোক এই সময়ের প্রধান অঙ্গীকার।