শিরোনাম:
ওজন কমাতে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কতটা কার্যকর? যা বলছেন বিশেষজ্ঞরা

ফাইল ছবি
১৯ আগস্ট ২০২৬, ১১:৪৬
নিউজ ডেস্ক
ওজন কমানো ও স্বাস্থ্য ভালো রাখার উপায় হিসেবে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং বা বিরতিহীন উপবাসের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। তবে এটিকে ‘জাদুকরী’ কোনো পদ্ধতি হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এখনো নেই বলে জানিয়েছেন পুষ্টিবিদ ও গবেষকরা।
গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অনুসরণ করলে ওজন কমতে পারে এবং রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের মতো কিছু বিপাকীয় সূচকে উন্নতি হতে পারে। তবে প্রচলিত অন্যান্য কার্যকর খাদ্যাভ্যাসের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি কার্যকর—এমন প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি।
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কী?
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং এমন একটি খাদ্যাভ্যাস, যেখানে দিনের নির্দিষ্ট সময় বা সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে খাবার গ্রহণ সীমিত রাখা হয়। এর বহুল প্রচলিত একটি পদ্ধতি হলো ১৬ ঘণ্টা না খেয়ে থাকা এবং বাকি ৮ ঘণ্টার মধ্যে খাবার গ্রহণ করা। আবার কিছু পদ্ধতিতে সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে ক্যালরি গ্রহণ কমিয়ে দেওয়া হয়।
সাধারণত ওজন নিয়ন্ত্রণ ও সম্ভাব্য বিপাকীয় উপকার পাওয়ার জন্য এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে রমজানের রোজার সঙ্গে এক করে দেখা উচিত নয়। রমজানের রোজা মূলত ধর্মীয় অনুশীলন, যার সঙ্গে ইবাদত, আত্মসংযম ও সহমর্মিতার বিষয় জড়িত।
গবেষণায় কী পাওয়া গেছে?
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে বিপাকক্রিয়া উন্নত করা, রক্তে শর্করা ও রক্তচাপ কমানো, কোষের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ পুনর্গঠন এবং ক্যানসারসহ বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি কমানোর উপায় হিসেবে প্রচার করা হয়। তবে এসব দাবির অনেকগুলোর পক্ষে মানুষের ওপর পরিচালিত গবেষণায় এখনো পর্যাপ্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয় শিকাগোর পুষ্টিবিষয়ক গবেষক ক্রিস্টা ভারাডি বলেন, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কোনো ‘জাদুকরী’ পদ্ধতি নয়।
তার মতে, গবেষণায় দেখা গেছে এ পদ্ধতিতে ওজন কমানো সম্ভব। তবে অন্য কার্যকর খাদ্যাভ্যাসের তুলনায় এটি যে উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি কার্যকর, তা এখনো প্রমাণিত হয়নি।
মানুষের তুলনায় প্রাণীর গবেষণায় ইতিবাচক ফল বেশি
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে প্রাথমিক গবেষণার বড় একটি অংশ হয়েছে ইঁদুর, মাছি ও কৃমির মতো প্রাণীর ওপর।
দীর্ঘ সময় খাবার না পেলে শরীর প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে গ্লুকোজের পরিবর্তে জমে থাকা চর্বি ব্যবহার করতে শুরু করে। এ সময় ‘অটোফ্যাজি’ নামের একটি প্রক্রিয়া সক্রিয় হতে পারে। এর মাধ্যমে কোষের পুরোনো বা ক্ষতিগ্রস্ত অংশ ভেঙে পুনরায় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়।
প্রাণীর ওপর কিছু গবেষণায় এসব প্রক্রিয়ার সঙ্গে স্বাস্থ্যগত উন্নতি ও আয়ু বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গবেষকরা সতর্ক করেছেন, প্রাণীর ওপর পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত ওজন কমতে পারে
ক্রিস্টা ভারাডির মতে, মানুষের ক্ষেত্রে ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংয়ের বিভিন্ন পদ্ধতি অনুসরণ করে সাধারণত প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত ওজন কমতে পারে। তবে অন্যান্য কার্যকর খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করেও প্রায় একই মাত্রার ওজন কমানো সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং অনুসরণকারীদের মধ্যে কোলেস্টেরল ও রক্তচাপের মতো কিছু বিপাকীয় ঝুঁকির সূচকে উন্নতি হতে পারে। কিছু গবেষণায় পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোমের (পিসিওএস) সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু উপসর্গেও সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তবে এক দিন পরপর উপবাসের মতো তুলনামূলক কঠোর পদ্ধতিতে শরীরের চর্বিহীন অংশ ও পেশি কমে যাওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গবেষকরা।
ক্যানসার ও মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যে উপকারের দাবি কতটা সত্য?
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিংকে মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং ক্যানসারের ঝুঁকি কমানোর উপায় হিসেবেও প্রচার করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণা এবং মানুষের ওপর পরিচালিত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফলাফলের মধ্যে এখনও বড় পার্থক্য রয়েছে।
প্রাণীর ওপর গবেষণায় উপবাসের সঙ্গে ক্যানসার প্রতিরোধের সম্ভাব্য সম্পর্ক পাওয়া গেলেও মানুষের ক্ষেত্রে এসব প্রভাব এখনো স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি।
কেমোথেরাপি নেওয়া মেটাস্ট্যাটিক স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত কিছু নারীর ক্ষেত্রে ৫:২ পদ্ধতির উপবাস নিয়ে একটি গবেষণায় সম্ভাব্য ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। তবে গবেষকরা এটিকে প্রাথমিক পর্যায়ের ফলাফল হিসেবে দেখেছেন এবং সাধারণ চিকিৎসা পরামর্শ হিসেবে গ্রহণ না করার পরামর্শ দিয়েছেন।
গবেষণায় বড় চ্যালেঞ্জ খাদ্যাভ্যাসের সঠিক তথ্য
ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং নিয়ে গবেষণার অন্যতম বড় সমস্যা হলো অংশগ্রহণকারীরা প্রকৃতপক্ষে কী পরিমাণ ও কী ধরনের খাবার খাচ্ছেন, তা সঠিকভাবে জানা।
গবেষণায় অনেক সময় অংশগ্রহণকারীদের খাবারের ডায়েরি রাখতে বলা হয়। কিন্তু অনেকে খাবার লিখতে ভুলে যান কিংবা খাবারের পরিমাণ কম করে উল্লেখ করেন। ক্রিস্টা ভারাডি জানিয়েছেন, তার গবেষণায় অংশ নেওয়া মাত্র প্রায় অর্ধেক ব্যক্তি সম্পূর্ণ খাদ্যতালিকার তথ্য জমা দেন।
২০২৫ সালের একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা দলের হিসাব অনুযায়ী, মানুষ প্রতিদিনের খাদ্য গ্রহণের পরিমাণ ৪০০ থেকে ৮০০ ক্যালরি বা তারও বেশি কম করে হিসাব করতে পারেন।
ভবিষ্যৎ গবেষণায় প্রযুক্তির ব্যবহার
খাদ্যাভ্যাস সম্পর্কে আরও নির্ভুল তথ্য পেতে গবেষকরা নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন। কিছু গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের খাবারের ছবি তুলতে বলা হচ্ছে। আবার কোথাও ক্যামেরাযুক্ত চশমা বা গলায় পরার মতো যন্ত্রের মাধ্যমে খাবার গ্রহণের তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
তবে এসব প্রযুক্তিতে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে ক্যামেরা ছাড়াই খাবার গ্রহণের তথ্য সংগ্রহের প্রযুক্তি নিয়েও কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা।
এর মধ্যে চিবানোর নড়াচড়া শনাক্ত করতে পারে এমন গলায় পরার যন্ত্র, খাবার গ্রহণের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য স্মার্ট কাঁটাচামচ এবং খাবারের বিভিন্ন উপাদান শনাক্ত করতে দাঁতে স্থাপন করা সেন্সর নিয়ে পরীক্ষা চলছে। তবে এসব প্রযুক্তির অধিকাংশই এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে।
রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষায় মিলতে পারে আরও নির্ভুল তথ্য
মানুষ কী ধরনের পুষ্টি গ্রহণ করছে এবং শরীর তা কীভাবে প্রক্রিয়াজাত করছে, তা জানতে রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
অ্যাবেরিস্টউইথ ইউনিভার্সিটির পুষ্টিবিষয়ক গবেষক থমাস উইলসনের মতে, ভবিষ্যতের গবেষণায় খাদ্য ডায়েরির সঙ্গে রক্ত ও প্রস্রাবের জৈবিক নমুনা এবং বিভিন্ন পরিধানযোগ্য ডিভাইস থেকে পাওয়া তথ্য একত্র করা যেতে পারে। এতে স্বাভাবিক জীবনযাত্রার মধ্য থেকেই আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা সম্ভব হতে পারে।
তাহলে কি ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং কার্যকর?
বর্তমান গবেষণার তথ্য বলছে, ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং ওজন কমাতে সহায়তা করতে পারে এবং কিছু বিপাকীয় স্বাস্থ্য সূচকে উন্নতি আনতে পারে। তবে এটিকে অসাধারণ বা ‘জাদুকরী’ কোনো খাদ্যাভ্যাস হিসেবে দেখার মতো পর্যাপ্ত প্রমাণ এখনো নেই।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাণীর ওপর পরিচালিত গবেষণার ফলাফল সরাসরি মানুষের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা উচিত নয়। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে শারীরিক পরিশ্রম, ঘুম ও অন্যান্য জীবনযাপন পদ্ধতিও স্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। তাই কোনো একটি খাদ্যাভ্যাসের একক প্রভাব নির্ধারণ করাও বেশ কঠিন।
সূত্র: সামা টিভি অনলাইন








