শনিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৭ ভাদ্র ১৪৩৩

আন্তর্জাতিক মহলে একটি বহুল প্রচলিত ধারণা রয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা (সিআইএ) কেবল বিপুল অর্থের প্রলোভন দেখিয়েই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের ‘গুপ্তচর’ বা ‘তথ্যদাতা’ নিয়োগ করে থাকে। তবে মার্কিন সংবাদমাধ্যম এনবিসি-এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রোমাঞ্চকর তথ্য। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিআইএ আসলে অর্থের চেয়েও লক্ষ্যবস্তু বানানো ব্যক্তির অবদমিত মানসিক অবস্থা ও দৈনন্দিন অতিপ্রয়োজনীয় চাহিদাকেই বেশি কাজে লাগাত।সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিআইএর তুখোড় ফিল্ড অফিসাররা সম্ভাব্য তথ্যদাতাদের বাগে আনতে প্রাক্তন স্ত্রীর ভরণপোষণ (অ্যালিমনি) পরিশোধ, ঘরের ফ্রিজ কেনা, দামী মদ সরবরাহ কিংবা সন্তানদের দামি শিক্ষা ব্যয় বহনের মতো অভিনব সব প্রতিশ্রুতির কৌশল গ্রহণ করতেন।অর্থ নয়, মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতাই প্রধান হাতিয়ারসাবেক গোয়েন্দাদের দাবি, অধিকাংশ ক্ষেত্রে মোটা অঙ্কের ক্যাশ টাকা গোপন তথ্য ফাঁসের মূল নিয়ামক ছিল না। বরং কোনো ব্যক্তির নিজ কর্মক্ষেত্রের ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের প্রতি চরম ক্ষোভ, ক্যারিয়ারের হতাশা, ব্যক্তিগত একাকীত্ব কিংবা নিজ দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সঙ্গে তীব্র আদর্শিক মতবিরোধ—এসব মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতা বিশ্লেষণ করেই সিআইএ তাদের জালে জড়াত।সংস্থাটির নিখুঁত নিয়োগ কৌশলের এক চরম উদাহরণ হিসেবে ২০০৮ সালের একটি ঘটনার উল্লেখ করা হয়েছে। তৎকালীন সময়ে আফগানিস্তানে কর্মরত প্রায় ৬০ বছর বয়সি এক প্রভাবশালী ফিল্ড কমান্ডারকে বাগে আনতে বিপুল অর্থ বা অস্ত্রের প্রস্তাব দেওয়া হয়নি; বরং মাত্র চারটি ‘ভায়াগ্রা’ ট্যাবলেট উপহার দিয়ে তাঁকে মার্কিন গোয়েন্দাদের পক্ষে তথ্য দিতে পুরোপুরি রাজি করানো হয়েছিল।দামি উপহার কেন এড়াত সিআইএ?অভিজ্ঞ গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, নগদ মোটা অঙ্কের অর্থ, হীরের গয়না কিংবা বিলাসবহুল গাড়ি উপহার দেওয়ার প্রচলিত পদ্ধতি অনেক সময়ই হিতে বিপরীত হতো। কারণ:সহজে নজর কাড়া: হুট করে কারও জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন এলে তা স্থানীয় বা নিজ দেশের কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্সের নজর কাড়ত।অস্ত্রের অপব্যবহার: উপহার হিসেবে দেওয়া অত্যাধুনিক অস্ত্র প্রায়শই অন্য কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা ভুল মানুষের হাতে চলে যাওয়ার ঝুঁকি থাকত।ইতিহাস কাঁপানো কিছু বিচিত্র সিআইএ এজেন্টপ্রতিবেদনে স্নায়ুযুদ্ধের আমলের কয়েকজন হাই-প্রোফাইল সোভিয়েত তথ্যদাতার বিচিত্র সব চাহিদার কথা তুলে ধরা হয়েছে:এজেন্টের নাম ও পরিচয়সিআইএ-র সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণ ও বিচিত্র চাহিদাদিমিত্রি পলিয়াকভ(সাবেক সোভিয়েত গোয়েন্দা কর্মকর্তা)নিজের প্রিয় সন্তানের করুণ মৃত্যুর পর ক্ষুব্ধ হয়ে তিনি সিআইএ-কে তথ্য দেওয়া শুরু করেন। তবে তিনি কোনো নগদ অর্থ নিতে সাফ অস্বীকৃতি জানান। বিনিময়ে তিনি সিআইএ-র কাছে বিদ্যুৎচালিত গৃহস্থালি যন্ত্রপাতি, উন্নত আগ্নেয়াস্ত্র ও শৌখিন মাছ ধরার আধুনিক সরঞ্জাম দাবি করেছিলেন।অ্যাডলফ টলকাচেভ(সোভিয়েত সামরিক প্রকৌশলী)সোভিয়েত ইউনিয়নের কঠোর সামরিক ব্লকে বসে তিনি সিআইএ-র হাতে ক্রেমলিনের বহু গোপন নথি তুলে দিয়েছিলেন। কোটি টাকা নয়, তাঁর একমাত্র বিশেষ অনুরোধ ছিল—তাঁকে যেন তৎকালীন নিষিদ্ধ পশ্চিমা পপ ও ক্লাসিক্যাল সংগীতের দুর্লভ ক্যাসেট ও রেকর্ড সংগ্রহ করে দেওয়া হয়।সাবেক সিআইএ কর্মকর্তা ডগলাস এই কৌশলের সারসংক্ষেপ টেনে বলেন, সংস্থাটি মূলত মানুষের একদম সাধারণ ও আটপৌরে দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর মাধ্যমেই তাদের মনস্তাত্ত্বিক দেয়াল ভেঙে নিখাদ আস্থা অর্জন করত। আর এই আস্থার চাদরে ঢেকেই সম্পন্ন হতো বিশ্বরাজনীতি ওলটপালট করে দেওয়া সব দুর্ধর্ষ গুপ্তচরবৃত্তি।