রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩

বিশ্ব অর্থনীতির অস্থিরতা, লাগামহীন মূল্যস্ফীতি এবং ক্রমবর্ধমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার এই সময়ে নিজের কষ্টার্জিত সঞ্চয় নিরাপদ রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ বিনিয়োগকারীদের আস্থার প্রধান কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে একটি মূল্যবান ধাতু—স্বর্ণ (Gold)। যুগ যুগ ধরে এটি নিরাপদ বিনিয়োগের অনন্য প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, সম্পদের মূল্য সংরক্ষণ, ঝুঁকি হ্রাস এবং দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল রিটার্ন পাওয়ার ক্ষেত্রে স্বর্ণের চেয়ে কার্যকর বিনিয়োগমাধ্যম খুব কমই আছে।

মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর সুরক্ষা (Hedge)
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মূল্যস্ফীতি বা পণ্যের দাম বাড়ার কারণে কাগজের মুদ্রার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ক্রমেই কমতে থাকে। অর্থাৎ, আজ যে পরিমাণ অর্থ দিয়ে একটি নির্দিষ্ট পণ্য কেনা সম্ভব, কয়েক বছর পর একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে তা আর কেনা যায় না। কিন্তু স্বর্ণ দীর্ঘমেয়াদে সম্পদের প্রকৃত মূল্য ও ক্রয়ক্ষমতা অক্ষুণ্ন রাখতে সহায়তা করে। এ কারণেই অর্থনীতিতে একে মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে একটি চমৎকার 'হেজ' বা সুরক্ষা কবচ বলা হয়।

পরিসংখ্যান কী বলে?
আন্তর্জাতিক বাজার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, গত ২০ বছরে যুক্তরাজ্যে বার্ষিক গড় মূল্যস্ফীতি ছিল প্রায় ৩ শতাংশ। অথচ একই সময়ে স্বর্ণের দাম বছরে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ হারে বেড়েছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতির প্রভাব পুরোপুরি বাদ দিলেও স্বর্ণের প্রকৃত মূল্য গড়ে প্রায় ৭ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সঞ্চয়কারীদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক।

অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটে ‘নিরাপদ আশ্রয়’
যেকোনো দেশের কাগজের মুদ্রার মান সাধারণত সেই দেশের সুদের হার, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুদ্রানীতি এবং বাজারে অর্থ সরবরাহের ওপর ওঠানামা করে। বিপরীতে, স্বর্ণের দাম কোনো নির্দিষ্ট দেশের নীতির ওপর নির্ভর করে না; বরং তা নির্ধারিত হয় আন্তর্জাতিক বাজারে এর বিশ্বব্যাপী চাহিদা ও জোগানের ভিত্তিতে।

এ কারণেই বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা, শেয়ার বাজারে ধস, কিংবা যুদ্ধবিগ্রহের মতো বড় ধরনের ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার সময় বড় বড় বিনিয়োগকারীরা কাগজের মুদ্রা বা শেয়ার ছেড়ে স্বর্ণের দিকে ঝুঁকে পড়েন। এমন পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে স্বর্ণকে 'সেফ হ্যাভেন অ্যাসেট' (Safe Haven Asset) বা নিরাপদ সম্পদ হিসেবে গণ্য করা হয়।

বিনিয়োগে ভারসাম্য ও ঝুঁকি হ্রাস (Portfolio Diversification)
একটি সুষম ও বুদ্ধিদীপ্ত বিনিয়োগ পরিকল্পনায় শুধু নগদ অর্থ, শেয়ার, বন্ড বা জমি-জমার ওপর নির্ভর না করে স্বর্ণকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রাখা উচিত। কারণ, শেয়ারবাজারে যখন বড় ধরনের পতন ঘটে বা অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, স্বর্ণের দাম তখন সাধারণত বিপরীতমুখী আচরণ করে অর্থাৎ বৃদ্ধি পায়। ফলে অন্যান্য খাতে বিনিয়োগের সম্ভাব্য লোকসানের প্রভাব বা ধাক্কা অনেকটাই সামলে নিতে সাহায্য করে এই মূল্যবান ধাতু।

বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়ন
বিশ্বখ্যাত বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান ফিডেলিটি ইন্টারন্যাশনাল-এর পার্সোনাল ইনভেস্টিং বিভাগের পরিচালক টম স্টিভেনসন মনে করেন, একটি শক্তিশালী বিনিয়োগ পোর্টফোলিও গঠনে স্বর্ণের কোনো বিকল্প নেই।

ভিন্নধর্মী সম্পদ: তাঁর মতে, স্বর্ণ শেয়ার বা বন্ডের মতো আচরণ করে না। এটি একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন ঘরানার সম্পদ হওয়ায় বিনিয়োগে বৈচিত্র্য আনে এবং ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে দেয়।

অন্তর্নিহিত মূল্য: প্রাচীনকাল থেকেই স্বর্ণ সম্পদ সংরক্ষণের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য মাধ্যম। স্বল্পমেয়াদে এর দামে কিছুটা ওঠানামা থাকলেও, দীর্ঘমেয়াদে এটি তার নিজস্ব অন্তর্নিহিত মূল্য ও মর্যাদা ধরে রাখতে শতভাগ সক্ষম।

পরিশেষে: অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং বৈশ্বিক সংকটের এই মেঘাচ্ছন্ন সময়ে স্বর্ণ কেবল অলঙ্কার বা একটি মূল্যবান ধাতুই নয়; বরং এটি আপনার অর্জিত সম্পদ রক্ষা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত করার সবচেয়ে বিশ্বস্ত দেওয়াল। (সূত্র: ফোর্বস)