রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩

মাত্র ১৮ বছর বয়সেই স্প্যানিশ সেনসেশন লামিন ইয়ামাল ফুটবল বিশ্বের এক নতুন আইকন হয়ে উঠেছেন। ২০১০ সালে স্পেনের বিশ্বকাপ জেতার পর, এই প্রথম লা রোজনাহদের আবারও ফিফা বিশ্বকাপের ট্রফি জয়ের ঐতিহাসিক মঞ্চে নিয়ে এসেছেন তিনি। ফাইনালে আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার আগে পুরো ফুটবল বিশ্বের চোখ এখন এই তরুণ তুর্কির ওপর।

চলতি বিশ্বকাপে তাঁর গোল সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও, ফাইনালে যদি কোনো এক মুহূর্তে তাঁর সেই জাদুকরী বাঁ পা বলকে জালে জড়িয়ে দেয়, তবে গ্যালারি জুড়ে দর্শকরা নিঃসন্দেহে ইয়ামালের সেই চেনা ও ট্রেডমার্ক উদযাপনটি দেখতে পাবেন। যখনই তিনি ক্লাব (বার্সেলোনা) বা দেশের হয়ে গোল করেন, তখন এই তরুণ উইঙ্গার দুই হাত আড়াআড়ি করে আঙুলের বিশেষ ভঙ্গিতে ‘৩-০-৪’ সংখ্যাটি ফুটিয়ে তোলেন।

কিন্তু বিশ্বমঞ্চ কাঁপানো এই উদযাপনের পেছনের আসল রহস্য ও গভীর অর্থটা কী?

শৈশবের স্মৃতি ও ‘৩০৪’ এর রহস্য
এই উদযাপনের পেছনের গল্পটি আসলে অত্যন্ত আবেগঘন ও মাটির কাছাকাছি। এগুলো হলো বার্সেলোনার অবহেলিত ও শ্রমজীবী মানুষের এলাকা রোকাফোন্দা (Rocafonda) পাড়ায় ইয়ামালের শৈশবের পোস্টকোডের (Postcode) শেষ তিনটি সংখ্যা।

পুরো পোস্টকোড: ০৮৩০৪ (08304), যা কাতালুনিয়ার মাতারো অঞ্চলে অবস্থিত।

শিকড়কে না ভোলা: এই গ্রীষ্মের বিশ্বকাপ জুড়ে একটি ছোটখাটো চোট নিয়ে খেললেও মাঠের পারফরম্যান্সে তার প্রভাব পড়তে দেননি ইয়ামাল। তাঁর জন্ম এসপ্লুগেস দে ইয়োব্রেগাতে হলেও, শৈশবের পুরোটা সময় কেটেছে রোকাফোন্দার এই সাধারণ পাড়াতেই।

কঠোর পরিশ্রমের গল্প: রোকাফোন্দা থেকে বার্সেলোনার বিখ্যাত যুব একাডেমি ‘লা মাসিয়া’য় (La Masia) ট্রেনে যেতে প্রতিদিন ৯০ মিনিট সময় লাগত। মাত্র সাত বছর বয়স থেকে এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েই ইয়ামাল নিজের অপ্রতিরোধ্য ফুটবল নৈপুণ্যকে শাণিত করেছেন। আজ বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ তারকা হয়েও তিনি তাঁর সেই সুবিধাবঞ্চিত শৈশবের ঠিকানাকে ভুলে যাননি।

বুটে বাবা-মায়ের প্রতি শ্রদ্ধা ও গিনির পতাকা
মাঠে নিজের শিকড়ের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন অবশ্য কেবল ‘৩০৪’ সংখ্যাটির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এই উইঙ্গার (যার পুরো নাম লামিন ইয়ামাল নাসরাউই এবানা) যখনই মাঠে নামেন, নিজের বুটের মাধ্যমে তাঁর বাবা-মা ও তাঁদের জন্মভূমির প্রতি এক অনন্য সম্মান প্রদর্শন করেন।

পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড: ইয়ামালের বাবা মুনির নাসরাউই মরক্কোর অধিবাসী এবং মা শিলা এবানা এসেছেন ইকুয়েটোরিয়াল গিনি থেকে।

কাস্টমাইজড বুট: ইয়ামালের জন্য বিশেষভাবে তৈরি এফ৫০ অ্যাডিডাস (Adidas F50) ফুটবল বুটগুলোতে শুধু ‘৩০৪’ সংখ্যাটিই খোদাই করা নেই, সেখানে একই সাথে মরক্কো এবং ইকুয়েটোরিয়াল গিনি—উভয় দেশের জাতীয় পতাকাই স্থান পেয়েছে।

মাঠেই সিজদায় কৃতজ্ঞতা প্রকাশ
‘৩০৪’ চিহ্ন প্রদর্শন করে নিজের শৈশব ও মাটিকে স্মরণ করার ঠিক পরপরই লামিন ইয়ামাল মাঠে আরেকটি বিশেষ কাজ করেন। নিজের ধর্মীয় ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাস থেকে গোল করার আনন্দ উদযাপনের অংশ হিসেবেই তিনি মাঠের পশ্চিম দিকে ফিরে মহান আল্লাহর দরবারে সিজদাবনত হয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

শিকড়, পরিবার এবং বিশ্বাসের এই অপূর্ব সংমিশ্রণই মাত্র ১৮ বছর বয়সি লামিন ইয়ামালকে ফুটবল মাঠের লড়াকু নায়কের পাশাপাশি কোটি ভক্তের হৃদয়ে এক অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।