শিরোনাম:
একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকলে সম্পত্তি ভাগ হবে কীভাবে?

ফাইল ছবি
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৯:৩২
নিউজ ডেস্ক
আজকের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় খবর
সন্তান থাকলে মুসলিম স্বামীর সম্পত্তিতে একাধিক স্ত্রী মিলে পান ৮ ভাগের ১ ভাগ, সন্তান না থাকলে ৪ ভাগের ১ ভাগ; হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ আইনে রয়েছে ভিন্ন বিধান
বাংলাদেশে একজন পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকলে তাঁর মৃত্যুর পর সম্পত্তির উত্তরাধিকার কীভাবে নির্ধারিত হবে—এ নিয়ে অনেকেরই কৌতূহল রয়েছে। বিশেষ করে একাধিক স্ত্রীর ক্ষেত্রে কে কতটুকু সম্পত্তি পাবেন, সন্তানদের অধিকার কী হবে কিংবা ধর্মভেদে উত্তরাধিকার আইনে কী পার্থক্য রয়েছে—এসব প্রশ্ন প্রায়ই সামনে আসে।
সম্প্রতি এমনই একটি ঘটনা সামনে এসেছে কুমিল্লার বাসিন্দা আজফর হোসেনকে ঘিরে। তাঁর দুই স্ত্রী থাকলেও প্রথম স্ত্রী ও তাঁর সন্তানেরা দ্বিতীয় স্ত্রীর বিষয়ে জানতেন না। ২০২২ সালে আজফর হোসেনের মৃত্যুর পর সম্পত্তি ভাগাভাগির সময় বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে।
সড়ক ও জনপথ বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত এই প্রকৌশলী ঢাকায় চাকরি করার সময় ধানমন্ডিতে একটি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করেছিলেন। পরে তাঁর পরিবার আরও ফ্ল্যাট ও প্লটের সন্ধান পায়। প্রথম স্ত্রীর তিন মেয়ে এবং দ্বিতীয় স্ত্রীর ঘরে এক ছেলে রয়েছে।
ধানমন্ডির পাঁচতলা ভবনটি কাগজপত্রে দ্বিতীয় স্ত্রীর নামে রেজিস্ট্রি ও নামজারি করা থাকায় সম্পত্তি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়।
তাহলে একজন মুসলিম পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকলে তাঁর মৃত্যুর পর সম্পত্তি কীভাবে বণ্টিত হয়? আর অন্য ধর্মের ক্ষেত্রে কী বিধান রয়েছে?
মুসলিম আইনে একাধিক স্ত্রীর অধিকার
বাংলাদেশে প্রচলিত মুসলিম আইনে একজন মুসলিম পুরুষ একই সময়ে সর্বোচ্চ চারজন স্ত্রী রাখতে পারেন। উত্তরাধিকার অবশ্য ব্যক্তির মৃত্যুর পরই সৃষ্টি হয়। জীবিত অবস্থায় ব্যক্তি তাঁর নিজস্ব সম্পত্তির মালিক থাকেন এবং আইনসঙ্গতভাবে তা বিক্রি, হেবা বা দান করতে পারেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উজ্জল ভৌমিকের মতে, কোনো মুসলিম পুরুষের মৃত্যুর পর তাঁর স্ত্রীর সংখ্যা, সন্তান আছে কি না এবং সন্তানদের সংখ্যা ও লিঙ্গসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর উত্তরাধিকার বণ্টন নির্ভর করে।
সন্তান থাকলে স্ত্রীরা পাবেন কত?
মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তাঁর একজন বা একাধিক স্ত্রী—সবাই মিলে স্বামীর সম্পত্তির ৮ ভাগের ১ ভাগ পাবেন।
অর্থাৎ, স্ত্রী একজন হলে তিনি একাই সম্পত্তির ৮ ভাগের ১ ভাগ পাবেন। একাধিক স্ত্রী থাকলে সেই ৮ ভাগের ১ ভাগ তাঁদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত হবে।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো ব্যক্তির চারজন স্ত্রী থাকলে এবং তাঁর সন্তান থাকলে চার স্ত্রী মিলে পাবেন মোট ৮ ভাগের ১ ভাগ। সেই অংশ চারজনের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে।
অন্যদিকে, মৃত ব্যক্তির সন্তান না থাকলে একজন বা একাধিক স্ত্রী মিলে তাঁর সম্পত্তির ৪ ভাগের ১ ভাগ পাবেন। একাধিক স্ত্রী থাকলে এই অংশও তাঁদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হবে।
তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রী ও সন্তানের অধিকার
কোনো ব্যক্তি তাঁর স্ত্রীকে তালাক দিলে সাধারণভাবে সেই স্ত্রী স্বামীর উত্তরাধিকারী হিসেবে সম্পত্তির অংশ পান না। তবে আইন অনুযায়ী তাঁর দেনমোহর ও ইদ্দতকালীন ভরণপোষণের পাওনা থাকতে পারে।
তবে তালাকপ্রাপ্ত স্ত্রীর ঘরে মৃত ব্যক্তির ঔরসজাত সন্তান থাকলে সেই সন্তান বাবার সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হবে।
হিন্দু আইনে একাধিক স্ত্রীর অধিকার
বাংলাদেশে হিন্দু উত্তরাধিকার আইনে সাধারণত দায়ভাগ পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়। আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, ঐতিহাসিকভাবে হিন্দু নারীর উত্তরাধিকার অধিকার মুসলিম আইনের তুলনায় ভিন্ন এবং অনেক ক্ষেত্রে সীমিত ছিল।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী উজ্জল ভৌমিকের বক্তব্য অনুযায়ী, একজন হিন্দু পুরুষ প্রথম স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করলে কেবল প্রথম স্ত্রীই আইনগতভাবে বৈধ স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি পান। দ্বিতীয় স্ত্রী আইনগত স্ত্রী হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়ায় স্বামীর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার বা ভরণপোষণের অধিকার নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হয়।
তাঁর মতে, প্রথম বিয়ে বহাল থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে আইনগতভাবে অকার্যকর হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এবং এ ধরনের বিয়ের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পুরুষের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪৯৪ ধারায় দ্বিবিবাহের অভিযোগও আসতে পারে।
হিন্দু বিধবার সম্পত্তির অধিকার
হিন্দু আইনের প্রচলিত ব্যবস্থায় স্বামী জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর সম্পত্তিতে স্ত্রীর সরাসরি উত্তরাধিকার তৈরি হয় না। স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রী নির্দিষ্ট অধিকার লাভ করেন।
আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, একজন হিন্দু বিধবা তাঁর স্বামীর একজন পুত্র যে পরিমাণ অংশ পেতেন, সেই সমপরিমাণ অংশ ‘জীবনস্বত্বে’ ভোগ করতে পারেন। অর্থাৎ, তিনি জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগ করতে পারবেন; তবে সাধারণভাবে নিজের ইচ্ছায় সেই সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারবেন না।
তবে স্বামীর শ্রাদ্ধ ও অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, দেনা পরিশোধ, নিজের ভরণপোষণ এবং সন্তানদের ভরণপোষণ, চিকিৎসা বা শিক্ষার মতো আইনগত প্রয়োজনের ক্ষেত্রে সম্পত্তি বিক্রির সুযোগ থাকতে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের আরেক আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকারের ব্যাখ্যায়, একাধিক স্ত্রী থাকলে প্রত্যেক স্ত্রী একজন পুত্রের সমপরিমাণ অংশ জীবনস্বত্বে ভোগদখল করতে পারেন। তাঁর উদাহরণ অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির ১০ জন পুত্র থাকলে মা একজন পুত্রের সমান অংশ পাবেন।
খ্রিস্টান আইনে কী বিধান?
বাংলাদেশে খ্রিস্টানদের ক্ষেত্রে একাধিক বিয়ের অনুমতি নেই। আইনজীবীদের বক্তব্য অনুযায়ী, কোনো খ্রিস্টান পুরুষ বা নারী তাঁর স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকা অবস্থায় আরেকজনকে বিয়ে করতে পারেন না।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, একজন দেশীয় খ্রিস্টানের স্বামী বা স্ত্রী জীবিত থাকলে তিনি অন্য কোনো দেশীয় খ্রিস্টানকে বিয়ে করতে পারেন না।
আইনজীবী প্রশান্ত কুমার কর্মকার বলেন, খ্রিস্টান আইনে দ্বিতীয় বিয়ের অনুমতি নেই। তবে স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী তাঁর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার পান এবং তিনি একজন পুত্রের সমপরিমাণ অংশ পেতে পারেন বলে তিনি জানান।
বৌদ্ধদের ক্ষেত্রে কী হয়?
আইনজীবী উজ্জল ভৌমিক ও প্রশান্ত কুমার কর্মকারের বক্তব্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বৌদ্ধদের উত্তরাধিকার বিষয়ে হিন্দু আইন অনুসরণ করা হয়।
সে হিসেবে বৌদ্ধ পুরুষের একাধিক স্ত্রী থাকলে প্রথম স্ত্রী ছাড়া অন্য স্ত্রীর উত্তরাধিকার নিয়ে আইনি স্বীকৃতির প্রশ্ন তৈরি হয়। অর্থাৎ, বৌদ্ধদের উত্তরাধিকার ব্যবস্থায়ও হিন্দু আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বিধান প্রযোজ্য বলে আইনজীবীরা জানিয়েছেন।
জীবিত অবস্থায় সম্পত্তি আর মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার এক নয়
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ—কেউ জীবিত থাকলে তাঁর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকারীদের অংশ তৈরি হয় না। ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তাঁর সম্পত্তির মালিক থাকেন এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী তা বিক্রি, দান বা হেবা করতে পারেন।
কিন্তু মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তি উত্তরাধিকার আইনের আওতায় চলে আসে। তখন সংশ্লিষ্ট ধর্মের ব্যক্তিগত আইন অনুযায়ী স্ত্রী, সন্তান ও অন্যান্য উত্তরাধিকারীর অংশ নির্ধারিত হয়।
তাহলে একাধিক স্ত্রী থাকলে মূল বিষয় কী?
একাধিক স্ত্রী থাকার ক্ষেত্রে সম্পত্তি বণ্টনের নিয়ম ধর্মভেদে আলাদা। মুসলিম আইনে সন্তান থাকলে একাধিক স্ত্রী মিলে মোট ৮ ভাগের ১ ভাগ এবং সন্তান না থাকলে ৪ ভাগের ১ ভাগ পান। একাধিক স্ত্রী হলে নির্ধারিত অংশটি তাঁদের মধ্যে সমানভাবে ভাগ হয়।
অন্যদিকে, হিন্দু, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধদের ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার আইন ও একাধিক বিয়ের বৈধতার প্রশ্নে ভিন্ন বিধান রয়েছে।
তাই কোনো ব্যক্তির মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে শুধু স্ত্রীর সংখ্যা বিবেচনা করলেই হবে না; মৃত ব্যক্তির ধর্ম, বৈবাহিক সম্পর্কের আইনগত বৈধতা, সন্তানদের পরিচয় ও সংখ্যা, সম্পত্তির ধরন এবং প্রযোজ্য ব্যক্তিগত আইন—সবকিছু বিবেচনা করেই চূড়ান্ত অংশ নির্ধারণ করতে হয়।









