শিরোনাম:
চোখে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় ১০ লাখ মানুষ, সার্জন সংকট চরমে

ফাইল ছবি
৩০ জুন ২০২৬, ০৭:১৩
নিউজ ডেস্ক
আজকের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় খবর
বাংলাদেশে মানুষের অন্ধত্বের প্রধান কারণ চোখের ছানিজনিত সমস্যা। দেশে মোট অন্ধত্বের প্রায় ৭৯ দশমিক ৬ শতাংশেরই মূল দায়ী এই ছানি, যেখানে বিশ্বব্যাপী এ হার মাত্র ৫১ শতাংশ। প্রতি বছর দেশে নতুন করে আরও ১ লাখ ৩০ হাজারের বেশি ছানি রোগী যুক্ত হচ্ছেন, যার ফলে বর্তমানে অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন প্রায় ১০ লাখ মানুষ। কিন্তু এই বিপুলসংখ্যক রোগীর বিপরীতে দেশে যোগ্য চক্ষু সার্জনের সংকট এখন চরম আকার ধারণ করেছে, যা প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় চার গুণ কম।
আজ মঙ্গলবার (৩০ জুন) বিশ্বব্যাপী পালিত ‘ছানি সচেতনতা মাস-২০২৬’ উপলক্ষে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে আয়োজিত এক বিশেষ আলোচনা সভায় এসব উদ্বেগজনক তথ্য তুলে ধরা হয়। সভার আয়োজন করে বাংলাদেশ সোসাইটি অব ক্যাটার্যাক্ট অ্যান্ড রিফ্র্যাকটিভ সার্জনস (বিএসসিআরএস)।
৮৩৩ জন রোগীর বিপরীতে মাত্র ১ জন সার্জন!
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংগঠনের সেক্রেটারি জেনারেল ডা. এএসএম মইন উদ্দিন। তাঁর উপস্থাপিত তথ্যে দেশের চক্ষুসেবার এক নাজুক চিত্র ফুটে ওঠে:
অপেক্ষমাণ রোগী: বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ছানি অস্ত্রোপচারের অপেক্ষায় আছেন।
সার্জন সংকট: প্রতি ৮৩৩ জন অপেক্ষমাণ রোগীর বিপরীতে দেশে যোগ্য সার্জন রয়েছেন মাত্র ১ জন।
সার্বিক ঘাটতি: দেশে বর্তমানে চক্ষু বিশেষজ্ঞ আছেন প্রায় ২,২০০ জন, যা আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় চাহিদার তুলনায় চার গুণ কম।
বঞ্চিত শিশুরা: দেশে আনুমানিক ৪০ হাজার অন্ধ শিশুর মধ্যে প্রায় ১২ হাজার শিশুর অন্ধত্ব চিকিৎসাযোগ্য হওয়া সত্ত্বেও তারা এখনো শৈশবকালীন ছানির অস্ত্রোপচার পায়নি।
“একজন সার্জনের ওপর যদি এক হাজারের কাছাকাছি রোগীর অস্ত্রোপচারের দায়িত্ব পড়ে, তবে কোনোভাবেই এই জমে থাকা জট বা রোগীর চাপ কমানো সম্ভব নয়। প্রতিরোধযোগ্য এই অন্ধত্ব নিয়ন্ত্রণে এখন একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ প্রয়োজন।”
— ডা. এএসএম মইন উদ্দিন
চিকিৎসাকেন্দ্রিক থেকে প্রতিরোধমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উদ্যোগ
আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. এসএম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ছানি এখনও বাংলাদেশে অন্ধত্বের অন্যতম প্রধান কারণ হলেও সময়মতো রোগ নির্ণয় এবং আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে অধিকাংশ রোগীই পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেতে পারেন। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার রূপান্তর প্রসঙ্গে তিনি বলেন:
“দীর্ঘদিন ধরে দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মূলত হাসপাতাল বা চিকিৎসানির্ভর থাকায় রোগের প্রাথমিক শনাক্তকরণে বড় ঘাটতি ছিল। সরকার এখন এই চিকিৎসাকেন্দ্রিক মডেল থেকে সরে এসে ‘প্রতিরোধ ও স্বাস্থ্য উন্নয়নকেন্দ্রিক’ ব্যবস্থায় রূপান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে। এখন ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মীদের মাধ্যমে নিয়মিত চোখসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগ প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করার ব্যবস্থা জোরদার করা হবে।”
‘৪০ বছরের পর চোখ পরীক্ষা বাধ্যতামূলক’
বিএসসিআরএস-এর সভাপতি অধ্যাপক ডা. মো. শওকত কবিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ছানি সচেতনতা মাস উদযাপন কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. এম. নজরুল ইসলাম।
আলোচক ও বিশেষজ্ঞরা জানান, বর্তমান যুগে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর ছানি অস্ত্রোপচার অত্যন্ত নিরাপদ, কার্যকর এবং দ্রুত আরোগ্য নিশ্চিত করে। তাই দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে গেলে ভয়, কুসংস্কার বা অবহেলা না করে দ্রুত চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তাঁরা ৪০ বছর বয়সের পর সবাইকে নিয়মিত চোখ পরীক্ষা করার আহ্বান জানান এবং একটি স্লোগান মেনে চলার পরামর্শ দেন:
“দৃষ্টিশক্তি ঝাপসা হয়ে গেলে অবহেলা নয়, চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন। সময়মতো ছানি অপারেশনই অন্ধত্ব প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।”
উল্লেখ্য, ‘ছানি সচেতনতা মাস’ উপলক্ষে জুন মাসজুড়ে বিএসসিআরএস-এর উদ্যোগে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিনামূল্যে চক্ষু পরীক্ষা, গণসচেতনতামূলক কর্মসূচি, চোখ পরীক্ষা ক্যাম্প এবং বৈজ্ঞানিক সেমিনার পরিচালিত হয়েছে। আজকের সমাপনী অনুষ্ঠানে দেশের শীর্ষস্থানীয় চক্ষু বিশেষজ্ঞ, শিক্ষক, রেসিডেন্ট চিকিৎসক ও বিভিন্ন চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।









