শিরোনাম:
এআই দিয়ে ভুয়া সংবাদ বানিয়ে আ.লীগের পক্ষে প্রচারণা, অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে চাঞ্চল্যকর তথ্য

ফাইল ছবি
১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪৪
নিউজ ডেস্ক
আজকের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় খবর
গাইবান্ধার এক ব্যক্তির ২৯ Claude অ্যাকাউন্টে ১,৫০০ ভুয়া শিরোনাম, ৩০০ মিথ্যা সংবাদ তৈরির দাবি
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বাংলাদেশে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পক্ষে ভুয়া সংবাদ ও অপপ্রচার চালানোর একটি নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়ার দাবি করেছে মার্কিন এআই প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রপিক। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, গাইবান্ধা জেলার এক ব্যক্তি প্রায় ১৬ মাস ধরে তাদের এআই চ্যাটবট ‘Claude’ ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে বিপুলসংখ্যক ভুয়া বাংলা সংবাদ, শিরোনাম ও ভিডিও কনটেন্ট তৈরির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার প্রকাশিত অ্যানথ্রপিকের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিষ্ঠানটি বলেছে, নেটওয়ার্কটি আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানোর পাশাপাশি দলটির রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য ছড়াত।
বিএনপি-জামায়াতসহ বিরোধীদের বিরুদ্ধে ভুয়া প্রচারণা
অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক কমিটিসহ আওয়ামী লীগের বিরোধীদের বিরুদ্ধে নানা ধরনের মিথ্যা গল্প তৈরি করা হতো।
এসব কনটেন্টে বিরোধীদের বিরুদ্ধে ‘তালেবান ধাঁচের’ শাসন প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা, নিরাপত্তা বাহিনীতে অনুপ্রবেশসহ বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ধরা হতো।
এ ছাড়া অন্তর্বর্তী সরকারের সদস্য ও ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের হত্যার ষড়যন্ত্র, তাঁদের বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার এজেন্ট এবং দুর্নীতি ও গোপন রাজনৈতিক আঁতাতে জড়িত থাকার মতো মিথ্যা দাবিও প্রচার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
অ্যানথ্রপিকের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব কার্যক্রম যখন চলছিল, তখন আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় ছিল না। ফলে প্রতিষ্ঠানটি এটিকে কোনো সরকারি প্রচারণা নয়, বরং একটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষে পরিচালিত কার্যক্রম হিসেবে বর্ণনা করেছে।
এক ব্যক্তির ২৯ Claude অ্যাকাউন্ট
অ্যানথ্রপিকের দাবি, গাইবান্ধার ওই ব্যক্তি ২৯টি Claude অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে প্রায় ১৬ মাস ধরে এই কার্যক্রম চালিয়েছেন।
এ জন্য তিনি ‘fake_news_3.py’ নামে একটি প্রোগ্রাম ব্যবহার করতেন। এর মাধ্যমে একসঙ্গে ১৫টি শিরোনাম, তিনটি বানানো সংবাদ এবং ১৫টি ছবির জন্য নির্দেশনা তৈরি করা হতো।
প্রতিষ্ঠানটির হিসাব অনুযায়ী, এই কার্যক্রমে অন্তত ১ হাজার ৫০০টি ভুয়া শিরোনাম, ৩০০টি মিথ্যা সংবাদ এবং ১ হাজার ৫০০টি ছবির নির্দেশনা তৈরি করা হয়েছে।
তবে Claude নিজে ছবি তৈরি করে না। তাই তৈরি করা নির্দেশনাগুলো অন্য কোনো এআই সিস্টেমে ব্যবহার করে ছবি বানানো হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করেছে অ্যানথ্রপিক।
ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকে ছড়ানো হতো
তৈরি করা ভুয়া কনটেন্ট পরে ফেসবুক লাইভ, ইউটিউব ও টিকটকে ছড়িয়ে দেওয়া হতো বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের দাবি, এই প্রচারণার অন্যতম লক্ষ্য ছিল গ্রামাঞ্চলের আওয়ামী লীগ সমর্থক এবং তুলনামূলক কম শিক্ষিত দর্শক।
নেটওয়ার্কটির একজন অপারেটর এক মাস আগেই ইউটিউবে ভিডিও প্রকাশের সময়সূচি নির্ধারণ করে রাখতে পারতেন। তৃতীয় পক্ষের একটি সেবার মাধ্যমে ভিডিও আপলোড করা হতো, যাতে পরিচালনাকারীর অবস্থান গোপন রাখা যায় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
‘কেউ জানে না খবরটি ভুয়া’
অ্যানথ্রপিকের দাবি, নেটওয়ার্কটির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি নিজেও জানতেন যে তৈরি করা খবরগুলো মিথ্যা। তাঁর একটি নোটে লেখা ছিল—‘কেউ জানে না খবরটি ভুয়া।’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কনটেন্টগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনাপূর্ণ ও আক্রমণাত্মক ভাষায় তৈরি করা হতো। একই সঙ্গে গ্রামের সাধারণ মানুষ যেন সহজে বুঝতে পারে, সে বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হতো।
অ্যাকাউন্ট নিষিদ্ধ করেছে অ্যানথ্রপিক
অ্যানথ্রপিক জানিয়েছে, অভ্যন্তরীণ তদন্তের মাধ্যমে তারা নেটওয়ার্কটির কার্যক্রম শনাক্ত করে। পরে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্টগুলো নিষিদ্ধ করা হয় এবং একই ধরনের অপব্যবহার শনাক্ত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেও তথ্য দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
অ্যানথ্রপিকের ‘Detecting and Countering Misuse of AI: September 2026’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশি এই নেটওয়ার্কের পাশাপাশি এআইয়ের অপব্যবহারের আরও কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে সাইবার হামলা, প্রভাব বিস্তারমূলক প্রচারণা, নজরদারি, অস্ত্র উন্নয়ন, জৈবিক অপব্যবহার, প্রতারণা এবং এআই মডেল চুরির মতো বিষয় রয়েছে।
একজনের পক্ষেও এখন বড় প্রচারণা সম্ভব
প্রতিষ্ঠানটির মতে, এআই প্রযুক্তির কারণে জটিল ধরনের অপারেশন পরিচালনার জন্য এখন সবসময় বড় দল বা বিপুল অর্থের প্রয়োজন হচ্ছে না। একজন ব্যক্তিও এমন পরিমাণ প্রচারণামূলক কনটেন্ট তৈরি করতে পারছেন, যা আগে হয়তো একটি পুরো দলের প্রয়োজন হতো।
ভারতের সম্পৃক্ততার প্রমাণ মেলেনি
অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে নেটওয়ার্কটির তৈরি কিছু কনটেন্টকে ‘ভারতপন্থি ভূরাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রতিষ্ঠানটি স্পষ্ট করেছে, এই কার্যক্রমের পেছনে কোনো রাষ্ট্রের নির্দেশনা বা অর্থায়নের প্রমাণ তারা পায়নি। ১৫৪ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে ভারতের প্রসঙ্গও সরাসরি এসেছে শুধু এই একটি জায়গায়।
অর্থাৎ, নেটওয়ার্কটির তৈরি কিছু কনটেন্ট ভারতপন্থি অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এর পেছনে ভারতীয় কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা প্ল্যাটফর্মের সরাসরি সম্পৃক্ততার প্রমাণ অ্যানথ্রপিকের প্রতিবেদনে নেই।
ফলে প্রতিবেদনটির মূল অনুসন্ধান হলো—এআই ব্যবহার করে বাংলাদেশে একটি ব্যক্তি-নির্ভর নেটওয়ার্ক কীভাবে ব্যাপক পরিসরে রাজনৈতিক অপপ্রচার ও ভুয়া কনটেন্ট তৈরি ও ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে।









