রবিবার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ৯ কার্তিক ১৪৩৩

২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্ট হুড সামরিক ঘাঁটিতে ১৩ জনকে গুলি করে হত্যার ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর নিদাল মালিক হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা করেছে মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ। আগামী ৩ ডিসেম্বর টেক্সাসের ফোর্ট হুডে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে। এটি কার্যকর হলে ছয় দশকেরও বেশি সময় পর যুক্তরাষ্ট্রে কোনো সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হবে।

বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ জানান, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য জনসাধারণের দেখার ব্যবস্থা করা হবে। বিবিসিকে প্রতিরক্ষা বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। তবে সম্প্রচারটি কোন প্ল্যাটফর্মে হবে এবং কারা তা দেখতে পারবেন, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানানো হয়নি। <Cite refs={["turn618366search6","turn618366search1"]}/>

রক্ষণশীল টেলিভিশন চ্যানেল ‘রিয়েল আমেরিকাস ভয়েস’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হেগসেথ বলেন, মানুষ যেন ঘটনাটি দেখতে পারে, তা নিশ্চিত করা হবে। তার ভাষ্য, এ ধরনের অপরাধের গুরুতর পরিণতি রয়েছে—মানুষের তা বোঝা প্রয়োজন।

মার্কিন সেনাবাহিনীর সেক্রেটারি অ্যাডাম টেলে জানান, ৩ ডিসেম্বর স্থানীয় সময় দুপুর ১টায় টেক্সাসের ফোর্ট হুডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরিকল্পনা রয়েছে। এর আগে ২ অক্টোবর প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এ মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন করেন। মার্কিন সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, হাসানের দোষী সাব্যস্ত হওয়া ও সাজা বহাল রাখার আপিলপ্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। ২০২৫ সালের মার্চে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টও তার আবেদন পর্যালোচনায় নিতে অস্বীকৃতি জানায়। <Cite refs={["turn618366search0","turn618366search3"]}/>

২০০৯ সালের সেই হামলা

ভার্জিনিয়ার বাসিন্দা নিদাল হাসান মার্কিন সেনাবাহিনীর মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ২০০৯ সালের ৫ নভেম্বর ফোর্ট হুডের একটি জনাকীর্ণ চিকিৎসাকেন্দ্রে গুলি চালিয়ে ১৩ জনকে হত্যা এবং আরও ৩২ জনকে আহত করেন তিনি। পরবর্তী সামরিক আদালতে তিনি দোষী সাব্যস্ত হন এবং ২০১৩ সালে তাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।

আদালতে হাসান হামলার দায় স্বীকার করেন। বিচার চলাকালে তিনি বলেছিলেন, আফগানিস্তানে মুসলিম ও তালেবানদের রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি ওই কাজ করেছিলেন বলে বিশ্বাস করতেন।

সম্প্রচার নিয়ে আইনি ও নৈতিক বিতর্ক

মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আইনি ও নৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বন্দিদের নিয়ে কাজ করা আইনজীবী জন মিলস এ উদ্যোগকে আধুনিক যুগে নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন। তার মতে, সরাসরি সম্প্রচারের আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

ইয়েল ল স্কুলের ভিজিটিং লেকচারার ইউজিন আর ফিডেলও সিদ্ধান্তটির সমালোচনা করেছেন। তার মতে, মৃত্যুদণ্ড সরাসরি সম্প্রচার করা মধ্যযুগীয় বর্বরতার মতো। অন্যদিকে, আইন বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ বলছেন, এ ধরনের সম্প্রচার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনসাধারণের সামনে নজিরবিহীন স্বচ্ছতা তৈরি করতে পারে।

তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য প্রচারের ক্ষেত্রে বয়সসীমা, দর্শক নিয়ন্ত্রণ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোর নীতিমালা কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকের মতো বড় প্ল্যাটফর্মে সহিংস ও স্পষ্ট মৃত্যুদৃশ্য সম্প্রচারের ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। ফলে সম্প্রচারের মাধ্যম ও পদ্ধতি নিয়ে আরও সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হতে পারে।

ছয় দশকের বেশি সময় পর সামরিক মৃত্যুদণ্ড

যুক্তরাষ্ট্রে সর্বশেষ সামরিক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল ১৯৬১ সালে। সে সময় এক মার্কিন সেনাকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। আর মার্কিন সামরিক বাহিনীতে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে সর্বশেষ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছিল ১৯৪৫ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে।

হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে তা হবে ১৯৬১ সালের পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম সামরিক মৃত্যুদণ্ড এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে প্রথম সামরিক মৃত্যুদণ্ড। সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনাটি কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ডের ইতিহাসেও তা নতুন বিতর্কের জন্ম দেবে।