মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

নেত্রকোনায় যৌতুকের দাবিতে স্ত্রীকে নির্মমভাবে নির্যাতন করে হত্যার দায়ে শফিকুল ইসলাম (৪২) নামে এক ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আসামিকে ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড এবং জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাসের সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে।

আজ বুধবার (২৪ জুন) দুপুরে নেত্রকোনার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের বিজ্ঞ বিচারক এ.কে.এম এমদাদুল হক জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন।

তবে এই মামলার অন্য দুই অভিযুক্ত—শফিকুল ইসলামের বাবা তোরাব আলী ও মা সখিনা খাতুনকে অপরাধে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না পাওয়ায় বেকসুর খালাস দেওয়া হয়েছে। রায় ঘোষণার সময় সাজাপ্রাপ্ত প্রধান আসামি শফিকুল ইসলাম কাঠগড়ায় উপস্থিত ছিলেন।

দাম্পত্য জীবন ও যৌতুকের নির্মমতা
আদালত ও মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার রত্নপুর গ্রামের সোনা মিয়ার মেয়ে পারভীন আক্তারের সঙ্গে প্রায় ১০ বছর আগে কলমাকান্দা উপজেলার ক্ষুদ্র সিধলী গ্রামের তোরাব আলীর ছেলে শফিকুল ইসলামের বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাদের সুখে-শান্তিতে দিন কাটলেও একপর্যায়ে তাদের সংসারে দুই ছেলেসন্তানের জন্ম হয়।

মামলার এজাহার অনুযায়ী, বিয়ের পর থেকেই শফিকুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময় পারভীনের ওপর যৌতুকের জন্য চাপ সৃষ্টি করে আসছিলেন। ২০১৯ সালের ২৫ মার্চ শফিকুল ইসলাম এক লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। পারভীন বাবার দরিদ্রতার কথা চিন্তা করে সেই টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে অমানুষিক মারধর করা হয়। একপর্যায়ে ক্ষোভে ও অভিমানে তিনি বাবার বাড়িতে চলে যান।

পরবর্তীতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে একটি পারিবারিক সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে বিষয়টির মীমাংসা করা হলে পারভীন আবারও স্বামীর সংসারে ফিরে যান।

ঘরে মিলল লাশের স্তূপ, থানায় মামলা
স্বামীর ঘরে ফিরে যাওয়ার এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে, ২০১৯ সালের ২৬ এপ্রিল গভীর রাতে পারভীনের আকস্মিক মৃত্যুর খবর পায় তার পরিবার। খবর পেয়ে স্বজনরা দ্রুত ওই শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে ঘরের বারান্দায় পারভীনের নিথর লাশ পড়ে থাকতে দেখতে পান। মামলার সুরতহাল ও তদন্ত নথি অনুযায়ী, পারভীনের শরীরের বিভিন্ন সংবেদনশীল স্থানে গুরুতর আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল।

আইনি প্রক্রিয়া:
ঘটনার পর কলমাকান্দা থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে এবং ময়নাতদন্তের জন্য নেত্রকোনা আধুনিক সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এরপর নিহত পারভীনের ভাই মো. আবু ইউসুফ বাদী হয়ে কলমাকান্দা থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশ্লিষ্ট ধারায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় স্বামী শফিকুল ইসলাম, শ্বশুর তোরাব আলী ও শাশুড়ি সখিনা খাতুনসহ অজ্ঞাতনামা আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়।

রাষ্ট্রপক্ষের বিশেষ কৌঁসুলি (পিপি) মো. নুরুল কবির রুবেল রায়ের বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, “দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া, চিকিৎসকের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এবং সাক্ষ্য-প্রমাণ পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা শেষে বিজ্ঞ আদালত স্বামী শফিকুল ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন। এই রায়ের মাধ্যমে ভুক্তভোগী পরিবার ন্যায়বিচার পেয়েছে এবং সমাজে অপরাধীদের কাছে একটি কঠোর বার্তা পৌঁছাবে।”