বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

জন্মের পরই মিলবে একক ডিজিটাল পরিচয়, এক কার্ডেই মিলবে বিভিন্ন সরকারি সেবা

দেশের সব নাগরিককে জন্মের পরই একটি একক পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা ‘এক-আইডি’ নামে এই পরিচয়পত্র নাগরিকের সারা জীবনের জন্য স্থায়ী ও স্বতন্ত্র পরিচয় হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সরকারি বিভিন্ন সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে এই একক পরিচয়পত্র ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। এ লক্ষ্যে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ নতুন একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে।

‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ (ডি-স্টার) নামের প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সময়কাল নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুমোদনের জন্য প্রকল্পটি ইতোমধ্যে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা।

জন্মের পরই মিলবে পরিচয়

বর্তমানে দেশে জন্মের পর শিশুদের জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হয়। ১৮ বছর বয়স হলে নাগরিকদের দেওয়া হয় জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি। তবে প্রস্তাবিত ‘এক-আইডি’ ব্যবস্থায় বয়সের কোনো সীমা থাকবে না। জন্মের পরই নাগরিককে এই একক পরিচয় দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নতুন এই ব্যবস্থা চালু হলে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরে নাগরিককে একই তথ্য বারবার দেওয়ার প্রয়োজন হবে না। একজন নাগরিকের পরিচয় ও প্রয়োজনীয় তথ্য একটি সমন্বিত ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।

তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, একক পরিচয়পত্র চালু হলে ধীরে ধীরে বিদ্যমান বিভিন্ন কার্ডের কার্যকারিতা এর মধ্যে একীভূত করার পরিকল্পনা রয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মাধ্যমে পাওয়া বিভিন্ন সেবাও ভবিষ্যতে ‘এক-আইডি’র মাধ্যমে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে এ বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

‘একজন নাগরিক, একটি ডিজিটাল পরিচয়, একটি ওয়ালেট’

একক পরিচয়পত্র তৈরির ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, এস্তোনিয়া ও ভারতের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে।

তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ নতুন এই ব্যবস্থার ধারণাকে ‘একজন নাগরিক, একটি ডিজিটাল পরিচয়, একটি ওয়ালেট’ হিসেবে তুলে ধরেছেন। অর্থাৎ একজন নাগরিকের একটি পরিচয়পত্র থাকবে, সেটিই হবে তার ডিজিটাল পরিচয়। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ডিজিটাল লেনদেনের সুবিধাও দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে প্রস্তাবিত নতুন পরিচয়পত্রে ঠিক কী কী তথ্য থাকবে, তা এখনো চূড়ান্ত করা হয়নি।

১৮ কোটি নাগরিকের জন্য কার্ড

প্রকল্পের প্রাথমিক প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জনশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে দেশের প্রায় ১৮ কোটি নাগরিকের জন্য পরিচয়পত্র তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণ করা হবে ২০ কোটি।

প্রতিটি পলিকার্বোনেট চিপ কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ মার্কিন ডলার, যা বর্তমান হিসাবে প্রায় ২৪৬ টাকা। এর সঙ্গে প্রতিটি কার্ড বিতরণ ও সরবরাহে আরও ১ মার্কিন ডলার বা প্রায় ১২৩ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে।

অর্থাৎ উৎপাদন, মুদ্রণ, বিতরণ ও সরবরাহ মিলিয়ে প্রতিটি কার্ডে মোট ব্যয় হবে প্রায় ৩৬৯ টাকা।

প্রকল্প ব্যয় ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা

‘ডি-স্টার’ প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে আসবে ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা।

প্রকল্পটির সবচেয়ে বড় ব্যয় হবে কার্ড উৎপাদন, মুদ্রণ, বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ ও বিতরণে। এ খাতে মোট ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

কমতে পারে নাগরিক ভোগান্তি

বর্তমানে দেশে জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স ও কর শনাক্তকরণ নম্বরসহ বিভিন্ন ধরনের পরিচয়পত্র ও নম্বর চালু রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব তথ্যভান্ডারের মধ্যে কার্যকর আন্তসংযোগ তৈরি করা গেলে নাগরিকদের একই তথ্য বারবার দেওয়ার প্রয়োজন কমে আসবে। এতে সরকারি সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে নাগরিকদের ভোগান্তি কমার পাশাপাশি সেবাদানের প্রক্রিয়াও আরও সহজ ও কার্যকর হতে পারে।

তবে ‘এক-আইডি’ চালুর আগে এর তথ্য সুরক্ষা, গোপনীয়তা, বিভিন্ন তথ্যভান্ডারের আন্তসংযোগ এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো যথাযথভাবে নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।