রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩

প্রথাগত জ্বালানি ও কার্বন নির্গমনের দিন পেরিয়ে পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব রেল যোগাযোগের এক নতুন যুগে পদার্পণ করল প্রতিবেশী দেশ ভারত। দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্পূর্ণ নিজস্ব প্রযুক্তিতে তৈরি ভারতের প্রথম ‘হাইড্রোজেন ফুয়েল সেল’ চালিত ট্রেনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন। উত্তর রেলওয়ের ৮৯ কিলোমিটার দীর্ঘ জিন্দ-সোনিপৎ রুটে চলাচলকারী ১০ কোচের এই ট্রেনটিকে বিশ্বের দীর্ঘতম ও সবচেয়ে শক্তিশালী হাইড্রোজেন ট্রেন হিসেবে অভিহিত করেছেন রেল কর্মকর্তারা।

এই যুগান্তকারী উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে জার্মানি, জাপান, চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশগুলোর পর এবার ভারতও রেল যোগাযোগে দূরদর্শী হাইড্রোজেন প্রযুক্তির এলিট ক্লাবে নিজের নাম লেখাল।

কীভাবে চলে এই ট্রেন? প্রযুক্তির অন্দরমহল
প্রথাগত ডিজেল ইঞ্জিনের সম্পূর্ণ বিপরীত ধারায় চলা এই হাইড্রোজেন ট্রেন কোনো ওভারহেড বৈদ্যুতিক তার (Overhead Wire) ছাড়াই সম্পূর্ণ নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় অনবোর্ড বিদ্যুৎ তৈরি করতে পারে।

১,২০০ কিলোওয়াটের ফুয়েল সেল: ট্রেনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি ১,২০০ কিলোওয়াটের প্রোটন এক্সচেঞ্জ মেমব্রেন ফুয়েল সেল, যা হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনের মধ্যে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে সরাসরি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া: ট্রেনের দুই প্রান্তে থাকা দুটি পাওয়ার কারের উচ্চ-চাপ সিলিন্ডারে সংকুচিত হাইড্রোজেন গ্যাস বহন করা হয়। এই হাইড্রোজেন যখন ফুয়েল সেলে প্রবেশ করে, তখন একটি প্ল্যাটিনাম অনুঘটকের সাহায্যে হাইড্রোজেনের প্রোটন ও ইলেকট্রন আলাদা হয়ে যায়। ইলেকট্রনগুলো যখন একটি বাহ্যিক বৈদ্যুতিক সার্কিটের মধ্য দিয়ে যেতে বাধ্য হয়, তখনই শক্তিশালী বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয় এবং তা ট্রেনের ট্র্যাকশন মোটরকে সচল করে।

পরিবেশবান্ধব উপজাত: একই সময়ে চারপাশের বাতাস থেকে নেওয়া অক্সিজেন হাইড্রোজেন প্রোটন ও ইলেকট্রনের সাথে মিলিত হয়। এই সম্পূর্ণ তড়িৎ-রাসায়নিক প্রক্রিয়ায় কোনো দহন বা ধোঁয়া তৈরি হয় না। ফলে ক্ষতিকারক কার্বন নির্গমনের পরিবর্তে উপজাত (Byproduct) হিসেবে কেবল জলীয় বাষ্প ও তাপ নির্গত হয়।

ফুয়েল সেল থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ শক্তিশালী লিথিয়াম আয়রন ফসফেট ব্যাটারিতে জমা থাকে, যা ট্রেনটি যখন গতি বাড়ায় তখন অতিরিক্ত বুস্ট জোগায় এবং ব্রেকিংয়ের সময় উৎপন্ন শক্তি পুনরুত্পাদন (Regenerative Braking) করে সংরক্ষণ করে।

শক্তির ঘনত্ব ও রিফুয়েলিং স্টেশন
ডিজেলের তুলনায় হাইড্রোজেনের শক্তির ঘনত্ব অনেক বেশি। যেখানে ডিজেলের শক্তির ঘনত্ব প্রতি কেজিতে ৪৩ মেগাজুল, সেখানে হাইড্রোজেনের ক্ষেত্রে তা প্রায় ১২০ মেগাজুল। ফলে এটি কোনো কার্বন নির্গমন ছাড়াই উচ্চ কর্মক্ষমতা নিশ্চিত করতে পারে।

এই মেগা ট্রেনকে সার্বক্ষণিক সচল রাখতে হরিয়ানার জিন্দে ভারতের বৃহত্তম রেলওয়ে হাইড্রোজেন স্টোরেজ এবং রিফুয়েলিং স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। সম্পূর্ণ দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি এই হাই-টেক কেন্দ্রে প্রায় ৩,০০০ কেজি হাইড্রোজেন নিরাপদে সংরক্ষণ করা সম্ভব।

ট্রেনের ধারণক্ষমতা ও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
রিসার্চ, ডিজাইন অ্যান্ড স্ট্যান্ডার্ডস অর্গানাইজেশন (RDSO)-এর কারিগরি নির্দেশনায় নির্মিত এই ১০ কোচের ট্রেনটিতে এক ট্রিপে প্রায় ২,৬০০ যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১১০ কিলোমিটার গতিবেগের নকশায় তৈরি এই ট্রেনটি আপাতত সুরক্ষার স্বার্থে ৭৫ কিলোমিটার গতিতে চালানো হবে। জিন্দ জংশন, গোহানা জংশন এবং সোনিপতের মধ্যে সংযোগকারী এই ট্রেনের সুরক্ষায় যুক্ত রয়েছে:

হাইড্রোজেন লিক ডিটেক্টর ও ফ্লেম ডিটেকশন সিস্টেম।

স্বয়ংক্রিয় হাইড্রোজেন শাট-অফ মেকানিজম।

চালকদের জন্য রিয়েল-টাইম হেলথ মনিটরিং ব্যবস্থা।

‘আত্মনির্ভর ভারত’ এবং ‘ন্যাশনাল গ্রিন হাইড্রোজেন মিশন’-এর অধীনে নেওয়া এই পাইলট প্রকল্পটি ভারতীয় রেলওয়েকে আগামী দিনে পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন ব্যবস্থার সম্প্রসারণে এবং দীর্ঘমেয়াদী নেট-জিরো (Net-Zero) কার্বন নির্গমনের লক্ষ্য অর্জনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা জোগাবে।

সংবাদের উৎস: ইন্ডিয়া টুডে (India Today)