বুধবার, ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

সম্পদ, বংশ ও সামাজিক মর্যাদার চেয়ে দীন, চরিত্র ও দায়িত্ববোধকে কেন বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে

বিয়ের প্রস্তাব এলে একটি মুসলিম পরিবারে সাধারণত যে প্রশ্নগুলো সবচেয়ে বেশি সামনে আসে, সেগুলো প্রায় একই—ছেলে কী করেন, কত আয় করেন, বাড়ি-গাড়ি আছে কি না, পরিবার ও বংশের সামাজিক মর্যাদা কেমন। এসব প্রশ্ন অপ্রাসঙ্গিক নয়। কারণ সংসার পরিচালনার সামর্থ্য ও পরিবারের দায়িত্ব নেওয়ার সক্ষমতাও বিয়ের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।

তবে ইসলামি ফিকহ ও হাদিসের আলোচনায় পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে বারবার যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে, তা হলো—ছেলেটির দীন ও চরিত্র কেমন?

দীন ও চরিত্রকে কেন অগ্রাধিকার?

সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের একটি হাদিসে এসেছে, কোনো ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে এলে তার দীন ও চরিত্রে সন্তুষ্ট হওয়া গেলে তার সঙ্গে বিয়ের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। অন্যথায় পৃথিবীতে ফিতনা ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়তে পারে। ইমাম তিরমিজি রহ. হাদিসটি বর্ণনা করে একে হাসান বলেছেন।

ইমাম ইবনে হাজার আসকালানি রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় উল্লেখ করেছেন, এখানে ‘দীন’ বলতে শুধু বাহ্যিক ইবাদত বোঝানো হয়নি; বরং আল্লাহভীতি, সৎকর্ম ও নৈতিকতার সামগ্রিক অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে, যা মানুষের আচরণেও প্রতিফলিত হয়।

ইমাম নববি রহ. তাঁর ‘শরহে মুসলিম’-এ দীনদারিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে দেখিয়েছেন, সম্পদ ও বংশমর্যাদা পরিবর্তনশীল; কিন্তু প্রকৃত দীনদারি একজন মানুষকে জীবনের নানা পরিস্থিতিতে ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল থাকতে সহায়তা করে।

শুধু নামাজ-দাড়ি নয়, চরিত্রও দীনদারির পরিচয়

আমাদের সমাজে দীনদারির ধারণা অনেক সময় সংকীর্ণ হয়ে পড়ে। নামাজ পড়া, দাড়ি রাখা কিংবা ধর্মীয় কথা বলাকেই অনেকে দীনদারির প্রধান বা একমাত্র প্রমাণ হিসেবে দেখেন। অথচ ইসলামি শিক্ষায় মানুষের চরিত্র ও লেনদেনের সততাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

একজন মানুষ তার স্ত্রীর সঙ্গে কেমন আচরণ করেন, বাবা-মায়ের প্রতি কতটা যত্নশীল, দুর্বল মানুষের সঙ্গে তার ব্যবহার কেমন এবং রাগের মুহূর্তে নিজেকে কতটা সংযত রাখতে পারেন—এসবও তার দীনদারির বাস্তব প্রকাশ।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে সেই সর্বোত্তম, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।” (তিরমিজি)

অর্থাৎ একজন মানুষের বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয় যতই দৃঢ় হোক, পরিবারে তার আচরণ যদি নিষ্ঠুর, অবিচারপূর্ণ বা দায়িত্বহীন হয়, তাহলে তার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ, তবে একমাত্র মাপকাঠি নয়

ইসলাম সম্পদ বা উপার্জনক্ষমতাকে গুরুত্বহীন বলেনি। স্বামীর ওপর পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব রয়েছে। তাই সম্ভাব্য পাত্রের উপার্জনক্ষমতা, দায়িত্ব নেওয়ার সামর্থ্য এবং তার উপার্জন হালাল কি না—এসব অবশ্যই বিবেচনা করা যেতে পারে।

তবে শুধু অর্থ-সম্পদ একজন মানুষকে যোগ্য পাত্র বানিয়ে দেয় না।

ফিকহে ‘কাফা’আহ’ বা বৈবাহিক সামঞ্জস্যের আলোচনায় বিভিন্ন মাজহাবের মধ্যে কিছু মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর অনুসারীদের মধ্যে এবং হাম্বলি ফিকহবিদ ইবনে কুদামা রহ.-এর ‘আল-মুগনি’ গ্রন্থে সম্পদকে স্থায়ী কোনো মাপকাঠি হিসেবে না দেখার বিষয়টি পাওয়া যায়। কারণ সম্পদ আসে-যায়। হানাফি মাজহাবে বংশ ও পেশাগত সামঞ্জস্যকে তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও মালিকি মাজহাবে দীনদারিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মাজহাবগত এই পার্থক্যের মধ্যেও একটি বিষয় স্পষ্ট—শুধু ধনী, প্রতিষ্ঠিত কিংবা সম্ভ্রান্ত পরিবারের ছেলে হলেই সে উত্তম পাত্র হয়ে যায় না।

বংশমর্যাদা নয়, তাকওয়াই মূল

বংশমর্যাদার প্রশ্নেও কুরআনের নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ।

সুরা হুজুরাতের ১৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন, “নিশ্চয় তোমাদের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে সম্মানিত সে-ই, যে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মুত্তাকি।”

তাফসিরে ইবনে কাসিরে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, বংশ ও গোত্রের পরিচয়ের মাধ্যমে মানুষ পরস্পরকে চিনতে পারে; কিন্তু আল্লাহর কাছে মর্যাদার মাপকাঠি হলো তাকওয়া।

বিয়ের ক্ষেত্রেও এই নীতির তাৎপর্য রয়েছে। একজন ছেলে তার পরিবারের সামাজিক অবস্থানের কারণে ভালো স্বামী হয়ে যান না; তার নিজের চরিত্র, তাকওয়া ও দায়িত্ববোধই তাকে সেই যোগ্যতা এনে দেয়।

রাগের সময় প্রকাশ পায় প্রকৃত চরিত্র

পাত্রের চরিত্র যাচাইয়ের ক্ষেত্রে রাগ নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

এক সাহাবি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপদেশ চাইলে তিনি বলেন, “রাগ করো না।” (সহিহ বুখারি)

ইমাম ইবনে রজব হাম্বলি রহ. এই হাদিসের ব্যাখ্যায় রাগের মুহূর্তে নিজেকে সংযত রাখাকে প্রকৃত শক্তির অন্যতম পরিচয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিয়ের ক্ষেত্রেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্বাভাবিক সময়ে ভদ্র ও বিনয়ী আচরণকারী একজন মানুষ রাগের মুহূর্তে কেমন আচরণ করেন, তা তার প্রকৃত চরিত্র সম্পর্কে অনেক কিছু প্রকাশ করতে পারে।

তাই পাত্রের মধ্যে অপমান করার প্রবণতা, হুমকি, অতিরিক্ত রাগ, নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ কিংবা সহিংসতার লক্ষণ রয়েছে কি না—এসব বিষয়কে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা উচিত নয়।

মেয়ের মতামত ও সম্মতিও গুরুত্বপূর্ণ

পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু অভিভাবকের সিদ্ধান্তই যথেষ্ট নয়। মেয়ের নিজের মতামত ও সম্মতির বিষয়টিও ইসলামী শরিয়তে গুরুত্বপূর্ণ।

সহিহ মুসলিমে এসেছে, পূর্বে বিবাহিত নারী নিজের ব্যাপারে তার অভিভাবকের চেয়ে বেশি অধিকার রাখেন। আর কুমারী নারীর কাছ থেকেও তার সম্মতি নিতে হবে; তার নীরবতাকে সম্মতি হিসেবে গণ্য করা হয়।

আয়েশা রা.-এর বর্ণনাতেও বিয়ের ক্ষেত্রে নারীর মতামতের গুরুত্ব পাওয়া যায়। ইমাম ইবনে হাজারের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, অভিভাবকের দায়িত্ব হলো উপযুক্ত পাত্রের সন্ধান করা ও কল্যাণের বিষয়টি বিবেচনা করা; তবে মেয়ের সম্মতিকে উপেক্ষা করা যায় না।

প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বিয়ের সিদ্ধান্তে অভিভাবকের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন মাজহাবে মতপার্থক্য রয়েছে। ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মত অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের বিয়ের বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অন্যদিকে অন্যান্য মাজহাবে অভিভাবকের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।

তবে বিয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মেয়ের ইচ্ছা ও সম্মতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা ইসলামের সামগ্রিক শিক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

তাহলে ইসলামের দৃষ্টিতে যোগ্য পাত্র কে?

সামগ্রিকভাবে ইসলামি শিক্ষার আলোকে পাত্র নির্বাচনের সময় তার আয়, বাড়ি-গাড়ি কিংবা বংশপরিচয়ের পাশাপাশি আরও কিছু বিষয় যাচাই করা জরুরি।

তিনি সত্যবাদী কি না, তার উপার্জন হালাল কি না, দায়িত্ব নিতে সক্ষম কি না, রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন কি না, নারীর মর্যাদা বোঝেন কি না, বাবা-মা ও পরিবারের সঙ্গে তার আচরণ কেমন এবং সংকটের সময় তিনি দায়িত্বশীল থাকবেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে দেখা প্রয়োজন।

কারণ বিয়ে শুধু দুই পরিবারের সামাজিক সম্পর্ক নয়; এটি দুজন মানুষের দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাত্রার অংশীদারত্ব।

ইমামদের আলোচনায় দীন ও চরিত্রকে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, তার মূল কারণও এখানেই। ধন-সম্পদ ও সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনশীল; কিন্তু একজন মানুষের চরিত্র, নৈতিকতা ও দায়িত্ববোধ তার দাম্পত্য জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে প্রভাব ফেলে।

তাই ইসলামের শিক্ষা কেবল ‘ধনী ছেলে খোঁজো’ নয়, **‘বড় বংশের ছেলে খোঁজো’**ও নয়। এমনকি শুধু বাহ্যিক ধর্মীয় পরিচয় দেখেই পাত্র নির্বাচনের কথাও বলা হয়নি।

শিক্ষাটি আরও গভীর—এমন একজন মানুষকে খুঁজতে হবে, যার দীন প্রকাশ পায় তার চরিত্রে, চরিত্র প্রকাশ পায় তার আচরণে এবং দায়িত্ববোধ প্রকাশ পায় পরিবারের প্রতি তার ব্যবহারে।

কারণ একজন মেয়ের জন্য সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা কোনো বড় বাড়ি, দামি গাড়ি কিংবা সামাজিক মর্যাদা নয়; বরং এমন একজন জীবনসঙ্গী, যার কাছে সে নিজের সম্মান, বিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ নিরাপদ মনে করতে পারে।

লেখক: কলামিস্ট ও শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়, কায়রো, মিশর