শিরোনাম:
১৩ বছরেই বিয়ে, হতাশা থেকে ইয়াবা—২৮ বছরের তরুণীর মাদকে জড়িয়ে পড়ার গল্প

ফাইল ছবি
২০ আগস্ট ২০২৬, ০২:০৬
নিউজ ডেস্ক
আজকের গুরুত্বপূর্ণ বিনোদন খবর
নিজস্ব প্রতিবেদক: ধনাঢ্য পরিবারে জন্ম। মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে। পরের বছরই সন্তানের মা হন। বয়সে প্রায় তিন গুণ বড় স্বামীর সঙ্গে দাম্পত্য জীবনে মানিয়ে নিতে না পারা, পারিবারিক টানাপোড়েন ও হতাশা—সব মিলিয়ে ধীরে ধীরে মাদকের জগতে জড়িয়ে পড়েন ২৮ বছর বয়সি এক তরুণী। ইয়াবা দিয়ে শুরু হওয়া সেই আসক্তি শেষ পর্যন্ত তাকে নিয়ে গেছে মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে।
তার মতো পারিবারিক, সামাজিক ও মানসিক নানা সংকটে পড়ে শিক্ষিত ও স্বচ্ছল পরিবারের অনেক তরুণীও মাদকের ঝুঁকিতে পড়ছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
নারকোটিক্সের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২০ সাল থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ছয় বছরে শুধু সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে ৩ হাজার ১০৬ জন নারী চিকিৎসা নিয়েছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ছিন্নমূল ও দরিদ্র নারীদের একটি বড় অংশ সরকারি কেন্দ্রে চিকিৎসা নিলেও উচ্চ ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীদের বেশির ভাগই বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি হন।
২৮ বছরের তরুণীর গল্প
রাজধানীর শ্যামলীতে বেসরকারি সংস্থা আহ্ছানিয়া মিশনের ৪০ শয্যার নারী মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রে বর্তমানে ৩১ জন চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদের মধ্যে ২০ জনই ইয়াবায় আসক্ত। চিকিৎসাধীনদের মধ্যে ১২ জন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, একজন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক, চারজন গৃহিণী, দুজন ব্যবসায়ী, একজন বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ১১ জন বেকার।
সম্প্রতি ওই নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন ২৮ বছর বয়সি এক তরুণী তার মাদকে জড়িয়ে পড়ার গল্প তুলে ধরেন।
তিনি জানান, ধনাঢ্য পরিবারে তার জন্ম। দাম্পত্য বিরোধের কারণে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে দেওয়া হয়। পরের বছরই তিনি সন্তানের জন্ম দেন। বয়সে প্রায় তিন গুণ বড় স্বামীর সঙ্গে তিনি সেভাবে মানিয়ে নিতে পারেননি। একপর্যায়ে জীবনের প্রতি হতাশা থেকে ধীরে ধীরে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন।
ওই তরুণী জানান, মাদকের জগতে জড়িয়ে পড়ার পর তিনি নিজেই দেখেছেন, স্কুল পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থীও মাদকে আসক্ত। বিশেষ করে ইয়াবার ব্যবহার ছড়িয়ে পড়েছে বলে তার দাবি। বিয়ের পর তিনি বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল ছেড়ে নতুন বাজার এলাকার একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে স্কুলগামী অনেক শিক্ষার্থীকে ইয়াবা সেবন করতে দেখেছেন বলেও জানান তিনি।
‘চিকন হওয়ার জন্য ইয়াবা’—ভয়ংকর ভুল ধারণা
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকাসক্ত তরুণীদের একটি বড় অংশ ইয়াবা ও গাঁজায় আসক্ত। বিশেষ করে ইয়াবা নিয়ে নারীদের মধ্যে একটি বিপজ্জনক ভুল ধারণা রয়েছে। স্বাস্থ্যবান বা অতিরিক্ত ওজনের কিছু তরুণী চিকন হওয়ার আশায় ইয়াবা সেবন করেন।
তবে ইয়াবার কারণে ক্ষুধামন্দা হয়ে সাময়িকভাবে ওজন কমলেও দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এমনকি বন্ধ্যত্বসহ বিভিন্ন জটিলতার আশঙ্কাও রয়েছে।
ব্যথানাশক থেকে মাদকে আসক্ত চিকিৎসক
আহ্ছানিয়া মিশনের নিরাময়কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী এক নারী চিকিৎসকও।
কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দীর্ঘ সময় আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। ওই সময়ে টানা কয়েক মাস তাকে ব্যথানাশক ইনজেকশন দেওয়া হয়। পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও ধীরে ধীরে তিনি ব্যথানাশকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন।
ওই চিকিৎসক জানান, ঘটনাক্রমে তার মাদকের প্রতি আসক্তি তৈরি হলেও অনেক চিকিৎসক প্রচণ্ড পেশাগত চাপ, পদোন্নতি-সংক্রান্ত পরীক্ষায় ব্যর্থতার ভয় কিংবা হতাশা থেকেও মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারেন।
মদেও বাড়ছে নারীদের আগ্রহ
ইয়াবার পাশাপাশি সম্প্রতি তরুণীদের মধ্যে মদ্যপানের প্রবণতাও বাড়ছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
চলতি বছর মদ পানের পারমিট বা লাইসেন্স পেতে এক হাজারের বেশি তরুণী নারকোটিক্সে আবেদন করেছেন। ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ৭০০ নারীর নামে পারমিট ইস্যু হয়েছে। আরও কয়েকশ আবেদন চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে বলে জানা গেছে।
নারকোটিক্স কর্মকর্তারা বলছেন, নারীদের ক্রমশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা যে কোনো সমাজের জন্য উদ্বেগজনক। অনেক ক্ষেত্রে অসৎ সঙ্গ, ছেলে বন্ধু কিংবা স্বামীর প্ররোচনায় নারীরা মাদক গ্রহণে জড়িয়ে পড়েন। আবার পরিবারে বাবা বা বড় ভাইয়ের ধূমপান কিংবা অ্যালকোহল গ্রহণের অভ্যাস থেকেও অন্য সদস্যদের মধ্যে মাদকের প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে পারে।
গুলশান, উত্তরা ও তেজগাঁওয়ে বেশি পারমিট
নারকোটিক্সের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর গুলশান, তেজগাঁও ও উত্তরা এলাকায় মদ পানের পারমিট নেওয়া নারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি। চলতি বছর গুলশানে ২৮৮, উত্তরায় ২০৭ এবং তেজগাঁওয়ে ৬২ জন নারী মদ পানের পারমিট নিয়েছেন।
এ ছাড়া ধানমন্ডি, মতিঝিল, খিলগাঁও ও রমনা এলাকা থেকেও নারীদের অনেকে মদ পানের পারমিটের জন্য আবেদন করেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, আবেদনকারীদের একটি অংশ বিভিন্ন বারে পেশাদার কর্মী হিসেবে কাজ করেন।
আইনের ফাঁক ব্যবহার করে পারমিটের অভিযোগ
প্রচলিত আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে মুসলিমদের মদ পানের লাইসেন্স পাওয়ার সুযোগ নেই। তবে বিশেষ কিছু রোগের চিকিৎসায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সীমিত অ্যালকোহল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আইনের এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে অনেকে মদ পানের পারমিট নিচ্ছেন। এমনকি ভুয়া বা নামসর্বস্ব চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যবহার করে পারমিট নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে নারকোটিক্স বিভাগের কিছু অসাধু সদস্যের যোগসাজশের অভিযোগও করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
শিক্ষিত তরুণীদের মধ্যেও বাড়ছে ঝুঁকি
আহ্ছানিয়া মিশনের নারী মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের পরামর্শক অঞ্জুমান আরা বলেন, সম্প্রতি শিক্ষিত তরুণীদের মধ্যেও মাদক গ্রহণের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে মদ ও ইয়াবার ব্যবহার লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তিনি জানান, চিকিৎসা নিতে আসা নারীদের মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। তাদের প্রতিষ্ঠানে ১৭ বছর বয়সি কিশোরী থেকে শুরু করে ৪৮ বছর বয়সি নারীরাও মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে ভর্তি হচ্ছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারীদের মাদকাসক্তি শুধু ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকি নয়, এর সঙ্গে পরিবার ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের বিষয় জড়িত। তাই মাদক প্রতিরোধের পাশাপাশি নারীদের জন্য সহজলভ্য ও সামাজিকভাবে নিরাপদ চিকিৎসা ও পুনর্বাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করা জরুরি।
সূত্র: যুগান্তর









