শিরোনাম:
পুলিশকে ভয় পাচ্ছে না অপরাধীরা, আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ

ফাইল ছবি
০১ অক্টোবর ২০২৬, ০৬:৩৯
নিউজ ডেস্ক
আজকের গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় খবর
দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও পুলিশের ওপর আক্রমণের ঘটনায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। অপরাধীদের গ্রেপ্তারে অভিযান চললেও এসব ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকানো এবং অপরাধের পেছনে থাকা ব্যক্তিদের শনাক্ত করা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) রাজধানীর মিরপুর-১০ এলাকায় ফুটপাত থেকে অবৈধ স্থাপনা ও হকার উচ্ছেদে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) অভিযান চলাকালে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ সময় ডিএনসিসির তিনটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় পুলিশের গাড়ি ও উচ্ছেদকাজে ব্যবহৃত একটি এক্সকাভেটর। সংঘর্ষে পুলিশ সদস্যসহ কয়েকজন আহত হন। এ ঘটনায় ১ অক্টোবর পর্যন্ত চারটি মামলা হয়েছে এবং ২৫ জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। <Cite refs={["turn794902search2","turn794902search5"]}/>
এর আগে ২৫ সেপ্টেম্বর রাজধানীর মিরপুর-১ এলাকায় রাড্ডা ম্যাটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ-ফ্যামিলি প্ল্যানিং সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হামলাকারীরা প্রতিষ্ঠানের একটি অংশ ভেঙে ফেলে এবং চিকিৎসাসেবা-সংশ্লিষ্ট সরঞ্জামসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় একাধিক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে হামলার সময় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে পুলিশি অবহেলা ছিল কি না, তা খতিয়ে দেখতে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্থানীয় সংসদ সদস্যের কথিত সম্পৃক্ততার অভিযোগও তদন্তাধীন বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। <Cite refs={["turn534936search7","turn534936search18","turn534936search19"]}/>
এ ছাড়া ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে রাজধানীর ইসিবি চত্বরসংলগ্ন দক্ষিণ মানিকদীতে নিউগিনি প্রোপার্টিজের আবাসন প্রকল্পে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। হামলায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সালমান মুক্তাদিরের ‘ব্রাউনফিশ’ স্টুডিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে এবং কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জমি নিয়ে বিরোধের বিষয়টি সামনে এসেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। <Cite refs={["turn534936search0","turn534936search2","turn534936search14"]}/>
রাজধানীর মোহাম্মদপুরে জমি দখলকে কেন্দ্র করে সশস্ত্র হামলা এবং আদাবরে কিশোর গ্যাংয়ের সংঘর্ষসহ বিভিন্ন ঘটনার খবরও সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় এসেছে। এসব ঘটনার ধারাবাহিকতা জননিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তবে বিভিন্ন ঘটনার কারণ, জড়িত ব্যক্তিদের পরিচয় ও সংশ্লিষ্টতার বিষয়গুলো তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বলেছেন, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনাগুলো সরকারের জন্য বিব্রতকর। তবে ৫ আগস্ট-পরবর্তী অস্থিতিশীল পরিস্থিতি থেকে দেশ অনেকটাই বেরিয়ে এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, পুলিশ বাহিনীকে কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে কোথাও বৃদ্ধি, কোথাও হ্রাস ঘটেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপরাধ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। <Cite refs={["turn794902search14","turn794902search12"]}/>
অন্যদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দিয়ে দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা ঠিক নয়। জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, অস্ত্রধারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান আরও জোরদার করা হবে বলেও জানান তিনি।
পুলিশ সদর দপ্তরের এআইজি (মিডিয়া) এএইচএম শাহাদাৎ হোসাইন জানান, সাম্প্রতিক অপরাধ নিয়ন্ত্রণে গোয়েন্দা নজরদারি, টহল ও চেকপোস্ট জোরদার করা হয়েছে। অপরাধপ্রবণ এলাকা ও অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশি তৎপরতা চালানো হচ্ছে। জনগণের সহযোগিতা নিয়ে অপরাধ প্রতিরোধ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) জানিয়েছে, ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে ১ অক্টোবর পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীতে নিয়মিত অপরাধবিরোধী অভিযানে ৪৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ সময় ৩১টি মামলা হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, অভিযানে মাদকদ্রব্য ও বিভিন্ন সরঞ্জামও উদ্ধার করা হয়েছে। <Cite refs={["turn794902search13"]}/>
অপরাধ বিশেষজ্ঞ ও সাবেক পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, শুধু গ্রেপ্তার অভিযান পরিচালনা করলেই অপরাধের স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। অপরাধের পেছনে থাকা অর্থদাতা, প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সংগঠিত চক্রের ভূমিকা থাকলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে আইনের আওতায় আনা জরুরি। তাঁদের মতে, আইন প্রয়োগে রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনায় না নেওয়া এবং পুলিশের পেশাগত সক্ষমতা ও মনোবল বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ।
সাবেক আইজিপি আব্দুল কাইয়ুমের মতে, জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে দৃশ্যমান ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। অপরাধীদের পাশাপাশি তাদের মদদদাতাদেরও শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি। একই সঙ্গে পুলিশ বাহিনীর মনোবল ও প্রশাসনিক কার্যক্ষমতা বাড়িয়ে আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার কথা বলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, অপরাধের মূল কারণ ও নেপথ্যের প্রভাবশালী চক্র শনাক্ত করা না গেলে গ্রেপ্তার অভিযান পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধান দিতে পারবে না। অপরাধীদের রাজনৈতিক পরিচয় উপেক্ষা করে আইনের আওতায় আনা না গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনআস্থার সংকট তৈরি হতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগের পাশাপাশি পুলিশের কার্যক্রম, অপরাধ প্রতিরোধের কৌশল এবং আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগের বিষয়গুলোকে সামনে এনেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের অভিযান ও তদন্তের পাশাপাশি অপরাধের পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ কতটা নেওয়া হচ্ছে, তা নিয়েও নজর রাখছেন সংশ্লিষ্টরা।









