শিরোনাম:
মেসওয়াক: শুধু দাঁত পরিষ্কার নয়, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের প্রিয় সুন্নত

ফাইল ছবি
০৩ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫২
নিউজ ডেস্ক
আজকের গুরুত্বপূর্ণ নববাংলা স্পেশাল খবর
ইসলাম ও জীবন: মানবজীবনের বাহ্যিক পরিচ্ছন্নতা যেমন সুস্থতার জন্য আবশ্যক, তেমনি মুখের পবিত্রতা একজন মুমিনের ইবাদত ও আধ্যাত্মিক উন্নতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামে পরিচ্ছন্নতাকে ইমানের অর্ধাংশ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। আর মুখের পরিচ্ছন্নতা রক্ষায় তাঁর সবচেয়ে প্রিয় ও বরকতময় এক নিয়মিত চর্চা ছিল মেসওয়াক।
আজকের আধুনিক যুগে টুথব্রাশ ও টুথপেস্টের সহজলভ্যতার কারণে অনেকেই মেসওয়াককে কেবল প্রাচীনকালের একটি সাধারণ উপকরণ মনে করেন। তবে হাদিসের আলোকে স্পষ্ট যে, মেসওয়াক কেবল দাঁতের বাহ্যিক ময়লা দূর করার মাধ্যম নয়; বরং এটি পরম করুণাময় আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের এক মহান সুন্নাহ।
মেসওয়াক: মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টির মাধ্যম
উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ করেছেন:
السِّوَاكُ مَطْهَرَةٌ لِلْفَمِ مَرْضَاةٌ لِلرَّبِّ
‘মেসওয়াক মুখকে পবিত্র করে এবং মহান প্রতিপালকের সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম মাধ্যম।’ (সহিহ বুখারি: ৮৮৭, সুনানে নাসাঈ: ৫, মুসনাদ আহমাদ: ২৪৩০৪)
এই সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ হাদিসটিতে মেসওয়াকের জাগতিক (মুখের দুর্গন্ধ ও অপবিত্রতা দূরীকরণ) এবং পারলৌকিক (আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ)—উভয় কল্যাণই একসঙ্গে সুনির্দিষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
উম্মতের প্রতি দয়ায় নফল রাখা গুরুত্ববহ সুন্নত
মেসওয়াক করা কতটা গুরুত্বাবহ ছিল, তা রাসুল (সা.)-এর অন্য একটি বাণী থেকে সুস্পষ্ট হয়। তিনি বলেছেন:
‘যদি আমার উম্মতের জন্য কষ্টকর না হতো, তবে আমি তাদের প্রতিটি অজুর সময় (অন্য বর্ণনায়—প্রত্যেক নামাজের পূর্বে) মেসওয়াক করা আবশ্যক বা ফরজ করার নির্দেশ দিতাম।’ (সহিহ বুখারি: ৮৮৭, সহিহ মুসলিম: ২৫২)
উম্মতের ওপর যেন বোঝা না হয়, সে কথা বিবেচনা করে মহানবী (সা.) এটিকে ফরজ করেননি; তবে এর মাধ্যমে বোঝা যায়—একজন সচেতন মুমিনের জীবনে এই সুন্নতের গুরুত্ব কতখানি সুদূরপ্রসারী।
জীবনপ্রদীপের শেষ মুহূর্তেও প্রিয় সুন্নাহ
নবীজি (সা.)-এর জীবনে মেসওয়াকের প্রতি ভালোবাসা সবচেয়ে আবেগঘন ও হৃদয়স্পর্শীভাবে ফুটে ওঠে তাঁর মৃত্যুর ঠিক পূর্বমুহূর্তে।
হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন অন্তিম শয্যায় তাঁর কোলে হেলান দিয়ে শায়িত ছিলেন, তখন তাঁর ভাই আবদুর রহমান ইবনে আবু বকর (রা.) হাতে একটি সতেজ মেসওয়াক নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করেন। অত্যন্ত দুর্বল অবস্থাতেও মহানবী (সা.) সেই মেসওয়াকটির দিকে দৃষ্টিপাত করেন। নবীজির মনের ভাব বুঝতে পেরে হজরত আয়েশা (রা.) মেসওয়াকটি নিজের দাঁত দিয়ে কামড়ে নরম করে রাসুল (সা.)-এর হাতে তুলে দেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত নিবিড়ভাবে তাঁর পবিত্র মুখমণ্ডল মেসওয়াক করেন এবং এর কিছুক্ষণ পরেই রফীকে আলার (মহান রবের) সান্নিধ্যে পাড়ি জমান। (সহিহ বুখারি: ৪৪৪৯)
কখন কখন মেসওয়াক করা বিশেষভাবে সুন্নত?
সুন্নাহ ও হাদিস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, প্রধানত আটটি বিশেষ সময়ে মেসওয়াক করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে:
অজুর সময়: অজুর শুরুতে কুলি করার পূর্বে মেসওয়াক করা সুন্নতে মুয়াক্কাদা।
প্রত্যেক নামাজের আগে: ফরজ কিংবা নফল—যেকোনো সালাতে দাঁড়ানোর পূর্বে মেসওয়াক করা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ।
ঘরে প্রবেশের মুহূর্তে: হজরত আয়েশা (রা.) জানান, রাসুল (সা.) বাইরে থেকে ঘরে প্রবেশ করেই সর্বপ্রথম মেসওয়াক করতেন। (সহিহ মুসলিম: ২৫৩)
জুমার দিনে: গোসল, সুগন্ধি ব্যবহারের পাশাপাশি জুমার দিনের বিশেষ পরিচ্ছন্নতার অংশ হিসেবে মেসওয়াক করা উত্তম।
ঘুম থেকে ওঠার পর: নিদ্রাভঙ্গের পর মুখের স্বাদ বা দুর্গন্ধ দূরীকরণে এটি প্রিয় নবীর নিয়মিত চর্চা ছিল।
কুরআন তিলাওয়াতের পূর্বে: আল্লাহর কালাম পাঠের আগে মুখ পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র রাখা আদবের অন্তর্ভুক্ত।
সিয়াম বা রোজা অবস্থায়: রোজা রেখে মেসওয়াক করলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না। রাসুল (সা.) রোজা থাকা সত্ত্বেও দিনে একাধিকবার মেসওয়াক করতেন।
মুখে দুর্গন্ধ বা ময়লা জমলে: যেকোনো সময় মুখের পরিবেশ বা স্বাদের পরিবর্তন ঘটলে মেসওয়াক করা সুন্নত।
মেসওয়াকের আদব ও আধুনিক যুগে প্রয়োগ
মেসওয়াক করার সময় ডান দিক থেকে শুরু করা এবং মাড়ি বা দাঁতের ক্ষতি না করে পরিমিত শক্তিতে ব্যবহার করা সুন্নত।
বর্তমান যুগে প্রতিদিন টুথব্রাশ-টুথপেস্ট ব্যবহারের মাধ্যমে আধুনিক স্বাস্থ্যবিধি পালনের পাশাপাশি যদি রাসুল (সা.)-এর ভালোবাসায় ও সুন্নতের নিয়তে প্রাকৃতিক মেসওয়াক (যেমন: নিম বা জাইতুন গাছের ডাল) ব্যবহার অব্যাহত রাখা যায়, তবে একই সাথে স্বাস্থ্যসুরক্ষা ও সুন্নতের অসীম সাওয়াব হাসিল করা সম্ভব।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে প্রিয়নবী (সা.)-এর এই বরকতময় প্রিয় সুন্নতটিকে দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।


